fbpx

অনামী

অনামী - জয়দীপ গোস্বামী

ইতিহাস এমন এক রঙ্গমঞ্চ যার প্রতিটি মুহুর্তে অভিনীত হচ্ছে কোন না কোন প্রেম কাহিনি। প্রেমিক প্রেমিকার মধুর প্রেম বন্ধনের মাধ্যমে মুখরিত এবং একাধারে আলোকিত হচ্ছে সময়। যার রেশ প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে  চলে আসছে। কোন কোন প্রেম কাহিনি পরিপূর্ণতা লাভ করে নিজের মনের ভাব প্রেম দিয়ে সময়কে মাতিয়ে রাখছে। আবার কিছু কিছু প্রেম কাহিনি কালের অতল গভীরে তলিয়ে যাচ্ছে। কালের করাল গ্রাসে প্রেমে ভাবিত দুটি প্রাণ নিঃশেষিত হচ্ছে যার কী আদেও পরিসমাপ্তি ঘটছে না কি কোন এক সময়ের প্রতিক্ষ্যাত আছে যাতে নিজেদের অস্তিত্বকে জানান দেওয়া যায়। নিজেদের মিলনের অতৃপ্ত বাসনা নিয়ে সময়ের পর সময় ধরে নিজেদের ব্যার্থ প্রেম কে পরিপূর্ণ করার আশায়। 
 
আজ থেকে প্রায় ৬০০০ বছর আগের ভারতবর্ষের রঙ্গমঞ্চে এমনই একটি প্রেম কাহিনি অভিনীত হয়েছিল। প্রাচীন আর্যাবর্তের পূর্ব পাঞ্চাল রাজ্যের রাজধানী অহিচ্ছত্রে। শোনা যায় সর্গে নাকি অপ্সরা বাস করে। রাজবাড়ির কনিষ্ঠা কন্যা প্রিয়ে কে  দেখতে ওই রকমই। রূপে নাম করা অপ্সরা রাও হার মানতো আর গুণে দেবী লক্ষ্মীর সাথে টক্কর দেওয়ার উপযুক্ত। তিনি যেমনই ছিলেন কলা নৈপুন্যে পারদর্শী তেমনই আবার সমস্ত প্রকার অস্ত্র শস্ত্র চালাতে পটু তাই তৎকালীন পাঞ্চাল আর্যাবর্ত কেন এই ভূ-ভারতেও তার সমতুল্য কেও ছিলো না।  
 
একদা রাজবাড়ির এক দ্বারপালপুত্র  বৈজায়ন্তক সৈনিক হিসেবে যোগদান করতে রাজবাড়ি আসে, তার বলীষ্ঠ, সুঠাম চেহারা নামকরা যোদ্ধাদেরও পশ্চাদপসরণ করে। শুধু তার দৈহিক গঠন না তার যুদ্ধ কৌশলও ছিলো অতি নিপূন। তাঁর যুদ্ধের কৌশল  খুবই কম সময়ের মধ্যে রাজার কর্ণগোচর হয়েছিলো। যার সুবাদে রাজা তাকে রাজার প্রধান দেহরক্ষী হিসেবে নিয়োগ করা হয়। 
 
 বেশ কয়েকদিন এভাবেই কেটে যায়। রাজকন্যাও তার কলানৈপুন্যে আরও পারদর্শী হয়ে ওঠে। তার পর সেই ওই সৈনিকের কথা জানতে পারে। তাদের এই মিলন পর্বও অতি রোমাঞ্চকর। প্রিয়ে আর বৈজায়ন্তক এর মিলন কাহিনি। রাজকুমারী প্রিয়ে বৈজায়ন্তকের সাথে অস্ত্র প্রদর্শনি করার ইচ্ছে প্রকাশ করেন। ওই অস্ত্র প্রদর্শনিতে স্বভাবতই বৈজায়ন্তক বিজয়ী হন। তার পর রাজকন্যা প্রিয়ের চিত্রপটে তখন বৈজায়ন্তক চিত্র অঙ্কিত হয়েছিল। চন্দ্রদেবের আকর্ষনে যেমন সমুদ্রের জলও জোয়ারে উদ্বেলিত হয়। ঠিক তেমনই মদনদেবের শরের আঘাতে রাজকন্যা প্রিয়ের অন্তরের অন্তস্থলে প্রেমের জোয়ার উদ্বেলিত হয়ে ওঠে। মনের মধ্যে মিলনের মধ্যে মিলনের বাসনা জাগ্রত হতে থাকে। অসম প্রেম আর রাজপরিবারের কোনো সদস্যার সাথে সামান্য এক সৈনিকের প্রেম কাহিনিতে প্রথমে বৈজায়ন্তক বাধা দেয়। কিন্তু রাজকন্যার মনের উদ্বেলিত প্রেমের জোয়ার বৈজায়ন্তকের রুক্ষ মনকে অল্পদিনের মধ্যে প্লাবিত করে। তার কয়েকদিন পর এলো সেই মাহেন্দ্রক্ষণ রাজকন্যার স্বয়ম্বর সভার আয়োজন করা হয়। কিন্তু ততোদিনে প্রেমের জোয়ার দুটি হৃদয়কে একত্রে প্লাবিত করেছে। রূপকথার বেঙ্গমা বেঙ্গমী যেমন একে ওপরকে ছাড়া একটি মুহুর্তও অতিক্রম করতে পারেনা সেই রূপ কোমল দুটি হৃদয় একে ওপরের সান্নিধ্য ছাড়া একমুহূর্ত যাপন দুষ্কর হয়ে ওঠে। তবে তাদের এই প্রেম কাহিনি বেশি দিন লোক চক্ষুর আড়ালে থাকতে পারেনি। রাজকন্যা যে এক সামান্য সৈনিকের প্রেমে বাধা পড়বে এই খবর রাজা ভালো৷ ভাবে নেয়নি। 
এরপর সেই প্রনয়ীদের জীবনে নেমে এলো সেই অভিশাপ। রাজার তরোবারি তীক্ষ্ণ ফলা বৈজায়ন্তকের রক্তে স্নান করেছিল। রাজকন্যা প্রিয়ের সাথে মিলিত হওয়ার অপরাধে রাজা তাঁর শিরচ্ছেদ করেন। তাদের এই মধুর প্রেম কাহিনি এই ভাবেই পরিসমাপ্তি ঘটে। বেঙ্গমী যেমন তার বেঙ্গমীর থেকে একমুহূর্তের জন্যেও অভিসারে থাকতে পারেনা, সারী যেমন তার শূকের সাথে বিচ্ছেদ করতে পারেনা রাজকন্যাও বিচ্ছেদ সহ্য করতে পারেনি। রাজকন্যা প্রিয়ের অন্য যায়গাতে প্রাতস্থ করা হয় কিন্তু প্রিয়ে বৈজায়ন্তকের স্মৃতি ভুলে থাকতে পারেনি, সেও নিজের জীবন বিসর্জন করে। তাদের প্রেমের পরিসমাপ্তি না ঘটার কারণে তাদের আত্মা অতৃপ্ত স্মৃতি গুলির সাথে রাজবাড়িতেই থেকে যায়। 
 
সময়! আপন গতিতে গতিশীল। কারোর জন্য নিজের ছন্দের বিঘ্ন ঘটায় না। সময়ের স্রোতেই প্রিয়ের সাথে বৈজায়ন্তকের মিলন আর সময়েই শেষ। কিন্তু এতে সময়ের মধ্যে পরিবর্তন আসেনি। বর্তমান সময়, বর্তমান সেই রাজবাড়ি আর নেই শুধু মুখর প্রেমে ভাবিত দুটি হৃদয়। নেই সময়কে নিজের প্রেম গাথা দিয়ে গাথিত করতে ব্যার্থ হওয়া সেই রাজকন্যা আর শরীরে রাজরক্ত নেই বলে রাজার তরবারি এক নিষ্পাপ প্রেমিকের রক্তে শাণিত হওয়ার কাহিনি। থেকে গেছে শুধু ওই রাজবাড়িটি। রাজাও সিংহাসন চ্যুত হয়েছে। পরাজিত হয়েছে গান্ধার রাজের কাছে। নেই রাজা নেই রাজার রাজত্ব আর তার সাথে সাথে রাজবাড়িও সময়ের ভারে জরাজীর্ণ হয়ে গেছে। সেই মর্মান্তিক কাহিনী আর অতৃপ্ত বাসনাকে নিজের মধ্যে সঞ্চিত করে মিলনের বাসনা আর অস্তিত্বকে টিকিয়ে রেখেছে। 
 
সময়ের গতি প্রকৃতি পাশ্ববর্তী গোটা জগৎ কে নিজের ছন্দে মাধ্যাকর্ষণ শক্তির ন্যায় বেঁধে রেখেছে। কোথাও যখন প্রেমে অপরিপূর্ণতার কারণে দুটি বিহেলিত প্রাণ নিশ্বেষিত হচ্ছে তখন অন্য কোথাও মদনবাণের আঘাতে জর্জরিত দুই হৃদয় রাজাজ্ঞা সহোযোগে শুভ পরিণয় সম্পন্ন করেছে কাম্পিল্য রাজকন্যা প্রিয়েশ্রিণী আর গান্ধারের রাজপুত্র জন্মজয়ন্তক।  এই প্রেম ভ্রমরার সাথে ফুলের প্রেমের মতো চঞ্চল। এই প্রেম সূর্যের কীরণের সাথে সূর্যমুখী ফুলের প্রেমের মতো স্নিগ্ধ। জুথিকা মালার মতো নিজেদের বাকি জীবনকে একই সুত্রে বেঁধে বাকি জীবন একসাথে কাটানোর জন্য। এক ক্ষেত্রে যেমন শরীরে শুধু রাজরক্ত নেই বলে রাজা নিজ হাতে তার কন্যার প্রণয়ীকে তরোবারীর আঘাতে হত্যা করেছেন ধৌত হয়েছে তরবারি আর অপর পক্ষে রাজা নিজ হাতে তার কন্যাকে তার প্রনয়ীর কাছে সম্প্রদান করেছে। পূর্ণিমার চাঁদের রশ্মীর সাথে যেমন দিঘিতে থাকা পদ্মের মিলন ঘটে, কুড়ি অবস্থা থেকে পরিপুর্ণ অবস্থায় নিজের সব রূপ উজাড় করে ঠিক তেমনই রাজা তাদের মিলন করিয়েছেন। নব দম্পতি সুখে শান্তিতে নিজ দাম্পত্য জীবন অতিবাহিত করছে। প্রেমে উদ্বেলিত হৃদয় প্রেমিকার কেশ রাশি মহাজাগতিক শোভা বর্ষন করছে। ওই চোখে স্নিগ্ধ সরল দৃষ্টি মনে শান্তি এবং শ্রীর ভারসাম্য বজায় রাখছে। প্রেমে বিকশিত প্রিয়েশ্রিণী আর জন্মজয়ন্তক একে অপরের পরিপূরক হিসেবে নিজেদের অস্তিত্ব ধারণ করছে। অহিচ্ছত্র আবার সেজেছে। চারিদিকে এক আনন্দের আমেজ। রাজবাড়ি জুড়ে আলোর রোশনাই। সেই বিচ্ছেদের ঘটনা মানব হৃদয় থেকে বহূদূরে সরে গেছে। সুখে কাটছে দিন, অতিবাহিত হচ্ছে সময় মধুর ভাবে মুখোরিত দুটি প্রাণ আপন ছন্দে বহমাণ। সময় তার কল্লোলের সঙ্গে ওদেরকেও বাহিত করছে। পাখিরা যেমন বাতাবরণ পরিবর্তন করে কয়েকদিনের জন্য পরিযায়ে বেরোয় ঠিক তেমনই ওরাও অভিসারে বেরিয়েছিল। কালের কী অপুর্ব লীলা তারা অহিচ্ছত্রের রাজবাড়িতেই আমন্ত্রিত নব দম্পতি নিজের প্রেমের প্রাপ্তির প্রতিক্ষা এবং মুক্তির আশায় দুটি আত্মা যখন নিজের অস্তিত্বকে এতোদিন টিকিয়ে রেখেছে সেই একই রাজবাড়িতে দুটি প্রাণের প্রেমের ভাবে গোটা রাজবাড়ি মনোরম হয়ে আছে। শুধু বর্তমান সময় আর সময়ের সাথে স্থির রাজবাড়ি। 
 
আরও কেটে গেছে কয়েকটা দিন প্রেমের ভাবে মুখরিত যখন   রাজবাড়ির প্রতিটি কোনা মেতেছে অনাবিল আনন্দে সবার প্রাণে প্রেমের জোয়ারের সম্ভার। কিন্তু অতৃপ্ত বাসনা নিয়ে নিজের অস্তিত্বকে টিকিয়ে রাখা দুটি প্রেম দম্পতির মনে ক্ষোভের ছায়া। তাদের মনে প্রতিহিংসার ছোঁয়া। নিজের অস্তিত্ব কে জানান দিয়ে রাজবাড়ি র মানুষদের মনে ভীতির সঞ্চার করার প্রচেষ্টা। অতিমানবিক ঘটনার সম্মুখীন হয় গোটা রাজবাড়ি। কিন্তু এর স্থায়িত্ব বেশিদিন টেকেনা। মধুর ভাবে তারাও ভাবিত হয়। নিজের প্রতিহিংসার কথা জানায় দম্পতির কাছে পরিত্রানের আশায়। তারা প্রিয়েশ্রিণী আর জন্মজয়ন্তকের কাছে। ব্যর্থতা মানুষের মানসচিত্তে আমূল পরিবর্তন আনে। চিত্তকে চঞ্চল করে তোলে। জোয়ারের প্রবল জলরাশি যেমন উপচে পড়ে ঠিক তেমনই। প্রতিহিংসারর বাঁধ মানবচিত্তকে ধ্বংস করে। অতৃপ্ত বাসনা বেড়ে যায়। আর ওই মানসচিত্তে প্রতিহিংসার সাথে তীব্রসংঘাত শুরু হয়।  তবে তারও স্থায়িত্ব বেশি হয়নি। প্রিয়ে আর বৈজায়ন্তক প্রিয়েশ্রিণী আর জন্মজয়নকের কাছে নিজের জীবন কাহিনি বর্ননা করে। একদিন রাজবাড়ী আবারও সেজে উঠেছিল বিবাহ মন্ডপে। তবে এই মিলন দুটি অলৌকিক মিলন এই মিলনের অন্ত নেই। যাগযজ্ঞে মাধ্যমে তাদের আত্মাকে প্রেমের বাধনে বেঁধে মুক্তিদান করে। প্রেমের দ্বারা প্রেমের মিলনের নজির গড়ে ওঠে রাজবাড়িতে। 
 
শেষ হলো জীবন। শেষ হলো প্রেমের দ্বারা প্রেমের প্রাপ্তি। আবারও প্রমাণিত হলো এই জগৎ প্রেম ভাবে ভাবিত হয়ে চলে। 
তাই জগতে প্রেম মানুষের সাথে সমগ্র পৃথিবীকে বাঁধতে পারে। সমপ্তি হলো অধ্যায়ের।