Posted on Leave a comment

দ্যা গ্রেট কলকাতা কিলিংস – জয়দীপ গোস্বামী

দ্যা গ্রেট কলকাতা কিলিংস - জয়দীপ গোস্বামী

পটভূমিকা ঃ
ইতিহাস বড়ো নির্মম আর নিষ্ঠুর। ইতিহাসের রঙ্গমঞ্চে কতো কতো ঘটনা লিপিবদ্ধ হচ্ছে, কতো সংগ্রাম,জিহাদ। আজ থেকে প্রায় ৭৫ বছর আগে ইতিহাসের রঙ্গমঞ্চে একটা মর্মান্তিক ঘটনা অভিনিত হয়েছিল। সেই ঘটনার মূল প্রেক্ষাপটে ছিল দুটি বিপরীতধর্মী মনোভাব। যার ব্যপকতা এতো তীব্র আকার ধারণ করেছিল যে মানুষ তার মধ্যে থাকা মনুষ্যত্ব টাকেই জলাঞ্জলি দিয়েছিল। হিংস্র নেকড়ের মতো নিরিহ মানুষের ওপর আক্রমণ করে হত্যা করার আগেও দুবার ভাবছিলো না। ঐতিহাসিক দৃষ্টিতে দিনটির ভয়াভয়তা এতো তীব্র ছিলো যে সেই সম্পর্কে ধারণা করতে গেলেই গা শিউরে ওঠে। 
১৯০৫ সালে লর্ড কার্জনের কুমস্তিষ্ক প্রসুত বাংলা বিভাজনের নিতি এই মর্মান্তিক নাটকের পটভূমি রচনা করেছিল। সম্প্রদায়ের ভিত্তি তে দেশ বিভাজন দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে যে ভাঙন তৈরি করেছিলো তারই পরিণতি এই নাটক। অবিভক্ত বঙ্গ তে শাসন প্রতিষ্ঠা করা যতটা সহজ ছিলো তা কায়েম করা দূরহ হয়ে পড়ে ছিলো তাই ঘনিষ্ট বন্ধুর মধ্যে ৩য় ব্যক্তির প্রবেশ যেমন বন্ধুত্বের অবসান করতে সক্ষম। ঠিক তেমনই ইংরেজরা হিন্দু এবং মুশলমান সম্প্রদায়ের মধ্যে বিবাদ সৃষ্টি করতে পারলেই একতা নষ্ট করা সম্ভব হবে। তাই ইংরেজরা বাংলাতে Divided and Rule চালু করার কথা চিন্তা করে। এবং বাংলা কে ধর্মের ভিত্তিতে বিভাজন করতে সচেষ্ট হয়। যা Petition of Bengal  নিতি নামে পরিচিত। এই বিভাজন সফল না হলেও তার তার প্রভাব অনেক গভীর পর্যন্ত বিস্তারিত ছিলো। Muslim সম্প্রদায়  নিজেদের সুরক্ষিত করার জন্য ১৯০৬ সালে আগা খাঁ র নেতৃত্বে ঢাকা তে  গঠন করে All Indian Muslim league   বা সর্বভারতীয় মুশলিম লীগ । যার প্রধান লক্ষ্য ছিলো মুশলিম দের মতানত স্বীকৃত করা। ১৯০৯ সালে মর্লে মিন্টো সংস্কারের মাধ্যমে কংগ্রেস এবং মুশলিম লীগের মধ্যে প্রথম স্বতন্ত্র নির্বাচন অনুষ্ঠিত করা হয়। এই নির্বাচনে উল্লেখ্য ভাবে জয় লাভ করে কংগ্রেস। এবং এর পর থেকেই দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে বিবাদ দেখা দেয়। 
 
মুশলিম লীগ এবং কংগ্রেস এর মধ্যে তীব্র প্রতিদন্দ্বিতার সৃষ্টি হয়।  Hindu majority  area India তে বেশি থাকার কারণে মুশলিম লীগ সংকটের মধ্যে পড়ে। Muslim majority area গুলোতে নির্বাচনের ফলাফল আশানুরূপ হলেও তা দিয়ে মুশলিমদের বিশেষ সুবিধে হচ্ছিলোনা। তাই তারা পৃথক রাষ্ট্রের জন্য সোচ্চার হয়ে ওঠে। ১৯১৪ সালে যখন গোটা পৃথিবী জুড়ে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের দামামা বাজতে থাকে তখন ভীত ইংরেজ ভারতীয় কংগ্রেসের কাছে সাহায্য চেয়ে আস্বাস দেয় তাদের স্বতন্ত্র করা হবে কিন্তু তা হয়নি। ১৯১৯ সালের ১৩ এপ্রিল পাঞ্জাবের জালিয়ানওয়ালাবাগে যখন ইংরেজ বাহিনী নিরস্ত্র সাধারণ মানুষের ওপর ৩৩ রাউন্ড গুলি বর্ষন করে গোটা পৃথিবী তার নিন্দাতে ভেঙে পড়ে। বিশ্বকবি কবিগুরু রবিন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর নাইট উপাধি ত্যাগ করেন।  ১৯২০ সালে সারা ভারত ব্যপি ভারত ছাড়ো আন্দোলন শুরু এই। এই আন্দোলনে উভয় সম্প্রদায় কে একত্রে ডাক দিলে কয়েকদিন সম্প্রতি রক্ষা পায়। ১৯২২ সালের ৫ই ফেব্রুয়ারি গান্ধীজির ডাকে সারা ভারত আবার মেতে ওঠে অসোহোযোগ আন্দোলনে। ১৯৩৭ সালের নির্বাচনে মুশলিম লীগ শোচনীয় ভাবে হারে। ওই নির্বাচনে এ.কে ফজলুল হকের নেতৃত্ব কৃষক প্রজা পার্টি  বাংলাতে সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে। এই ঘটনার পর মুশলিম লীগ তাদের পৃথক রাষ্ট্রের দাবিতে সোচ্চার হয়। ২য় বিশ্বযুদ্ধের সময় ইংরেজ সরকার ফের কংগ্রেসের কাছে সাহায্য পার্থনা করলে কংগ্রেস তা প্রত্যাখান করে। পরবর্তী কালে ইংরেজ সরকারের পক্ষ থেকে ঘোষণা করা হয় যে তারা ভারতকে স্বাধীনতা দেবে। ২য় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর ব্রিটেনে নতুন সরকার গঠন করা হয়। এবং ভারতকে স্বাধীনতা দান করার কথা ব্যার্থ প্রতিশ্রুতিতে পরিনত হয়। ২য় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন হিটলার প্রথম বিশ্বের প্রায় সব দেশ কেই পরাজিত করে। শুধু ব্রিটিশ বাহিনী লড়াই করতে থাকে এবং তাদের অবস্থাও করুন হয়ে যায়। ২য় বিশ্বযুদ্ধের সময় কংগ্রেসের কাছে সাহায্য পার্থনা করতে ১৯৪২ সালে ভারতে আসে স্যার স্ট্যফোর্ড ক্রিপ্স এর নেতৃত্বে ক্রিপ্স মিশন। এই মিশন প্রস্তাব রাখে যে ভারতকে Dominion Status দেওয়া হবে। এর অর্থ হলো ভারতের নেতারা দেশ শাসন করবে কিন্তু প্রধান ক্ষমতা থাকবে ইংরেজ দের কাছে।  কিন্তু কংগ্রেসের নেতারা তা প্রত্যাখান করে। কংগ্রেসের নেতারা বলেন ভারতকে পুর্ন স্বাধিনতা দিতে হবে তবেই সাহায্য করবে, কিন্তু তাতে ইংরেজরা রাজি ছিলেনা ।  কংগ্রেসের কাছে নানা প্রস্তাব আসতে থাকে কিন্তু কংগ্রেসের নেতারা সেই সব প্রস্তাবে রাজি ছিলোনা। পরবর্তি কালে মুশলিম লীগ পাকিস্তানের দাবি তে অটল থাকে কিন্তু কংগ্রেসের নেতারা দেশ বিভাজন নিতিতে রাজি ছিলোনা। পক্ষান্তরে ব্রিটিশরা বেঁকে বসে। ০৯ ই আগষ্ট ১৯৪২ সালে গান্ধীজি ভারত ছাড়ো আন্দোলন বা Quick India Movement র ডাক দেন। ধীরে ধীরে দুই সম্প্রদায়ের বিরোধ দেখা দেয়। ইংরেজদের তরফ থেকে বলা হয় দুই দল একসাথে নতুন পরিচালন সভা গঠন করুক কিন্তু মুশলিম লীগ এবং কংগ্রেস কেওই তা মানতে রাজি ছিলোনা। 
১৯৪০ সালে জিন্না লাহোর প্রস্তাবে পৃথক পাকিস্তানের দাবি করেন। তার ১৫ দিন পর গান্ধীজী হরিজন পত্রিকাতে সেই দাবি সমর্থন করে। এই দুটো ঘটনা একটা দেশকে বিভাজন করতে সক্ষম হয়ে যায়। ভারতীয় সভ্যতার কেন্দ্রবিন্দু দেশ থেকে বিভাজনের দাবি করতে থাকে। 
১৯৪৬ সালে ক্লিমেন্ট এটলি, স্যার ক্রিপস এর এবং স্যার ক্যবিনেট এর নেতৃত্বে ক্যবিনেট মিশন ভারতে আসে এবং ভারতে ক্ষমতা হস্তান্তর করার জন্য ভারতে আসে। কংগ্রেসের নেতারা যেমন জহরলাল নেহেরু, আবুল কালাম আজাদ, সর্দার প্যাটেল এবং মুশলিম লীগের পক্ষ থেকে মহম্মদ আলী জিন্না, লিয়াকত আলী কে একসঙ্গে নিয়ে আলোচনা সভা বসে। এই ক্যাবিনেট মিশন সর্তসাপেক্ষ ভাবে বিভাজন করাতে সচেষ্ট হলে কংগ্রেস তা প্রত্যাহার করে। 
ক্যাবিনেট সর্ত রাখে যে ভারত কে মূলত তিনটি ভাগে ভাগ করা হবে যথা ~
1st Hindu Majority : বিহার, উত্তরপ্রদেশ, হিমাচল প্রদেশ, মহারাষ্ট্র, দিল্লী, ওডিশা, শিকিম, মাদ্রাজ প্রভৃতি হিন্দু অধ্যুষিত রাজ্য গুলো থাকবে। 
2nd Muslim Majority area : পাঞ্জাব, বেলুচিস্তান, লাহোর ইত্যাদি মুশলিম অধ্যুষিত অঞ্চল এবং গুপ c তে বাংলা বিহার। 
 3rd independent area : যতদূর সম্ভব এই বিভাগে সেই সব রাজ্য গুলি ছিলো যারা পৃথক রাজনীতিতে বিশ্বাস করতো,যেমন কাশ্মির, জুনাগড়, হায়দ্রাবাদ প্রভৃতি। 
  এতে আরও বলা হয় যে অর্থনৈতিক, সুরক্ষা, সেনা এবং আন্তর্জাতিক ছাড়া বাকি সব ক্ষমতা রাজ্যের কাছে থাকবে। সিট গুলির ভাগ জনসংখ্যার ভিত্তিতে হবে  ।এবং কেন্দ্রের কাছে কম ক্ষমতা থাকবেভ। রাজ্য গুলি চাইলে নিজের পৃথক নিয়ম কানুন রাখতে পারবে।  এই শর্তে কংগ্রেস রাজি হয়নি। কারণ এইভাবে দেশের বিভাজন নিশ্চিত। কেন্দ্রের কাছে কম ক্ষমতা থাকবে এবং রাজ্য গুলি অধিক ক্ষমতা যুক্ত হবে। পরবর্তী নির্বাচনে তারা পৃথক দেশ গঠন করতে পারবে যা কংগ্রেস চায়নি। কিন্তু অপরপক্ষ তা স্বীকার করে। তারা এই বিভাজনে রাজি হয় কারণ মুশলিম লীগ জানতো আজ না হোক কাল তারা পৃথক পাকি পাকিস্তান পেয়ে যাবে। যদি বিভাজন সম্ভব হয়ে যায় তাদের পৃথক রাষ্ট্র হবে। কিন্তু কংগ্রেস তা মেনে নেয়নি। 
এরপর মুশলিম নেতা মহম্মদ আলী জিন্না বোম্বে থেকে ঘোষণা করে তারা এবার সংগ্রামের মাধ্যমে পৃথক দেশ দাবি করবে। কয়েকদিন পর দিন ঠিক করা হয় ১৬ই আগষ্ট কলকাতাতে পৃথক পাকিস্তানের দাবিতে প্রত্যক্ষ সংগ্রাম হবে।   লড়কে লেঙ্গে পাকিস্তান  ধ্বনি তোলে। 
বোম্বের একটি সভা থেকে জিন্না কংগ্রেস এবং সারা ভারতের উদ্দ্যেশ্যে বলেন – 
“ We didn’t want war. If you want war we accept your offer unhesitatingly. 
We will have divided India divided or a destroyed India.” 
 
১৯৪৬ সালের বাংলা ছিলো মুশলিম অধ্যুষিত। তাই প্রদেশিক নির্বাচনে জয়ী হত মুশলিম লীগ। ২৮এ এপ্রিল প্রত্যক্ষ সংগ্রামের ডাক দেওয়া হলে লীগ তা বাস্তবায়িত করতে সচেষ্ট হয়। 
৫ই আগষ্ট, ১৯৪৬ খ্রীষ্টাব্দে বাংলার তৎকালিন মুখ্যমন্ত্রী বা প্রধানমন্ত্রী সোরাবর্দি The statesman পত্রিকাতে লেখেন ‘ হিংসা ও রক্তপাত অন্যায় নয়, যদি তা মহান উদ্দেশ্য করা হয় ও মুশলমানদের কাছে পাকিস্তান আদায় করা ছাড়া অন্য কোনো প্রিয় কাজ নেই ‘। এই উক্তি টাই ঠিক করে দিয়েছিল যে হিন্দুদের কী দুরাবস্থা হতে চলেছে। মুশলিম লীগ অগন্তি লাশ এর ওপর নিজেদের পাকিস্তানের ভীত প্রস্তুত করতে চেয়েছিলো। 
 
১৯৪৬ সালের পুরো আগষ্ট মাস জুড়ে মুশলিমদের পবিত্র রমজান মাস। তারা রমজান মাসেই তাদের পরিকল্পনা বাস্তবায়িত করতে চেয়েছিলো। নবি যেমন রমজান মাসে মক্কা থেকে বিধর্মীদের হত্যা করে মক্কা মুশলিমের হস্তগত করেছিলেন ঠিক সেই ঘটনারই পুনরাবৃত্তি ঘটাতে চেয়েছিলো। ১৬ ই আগষ্ট তাদের পবিত্র জুম্মা ছিলো। ওইদিনই তারা হিন্দুদের নৃশংস ভাবে হত্যা করে পৃথক পাকিস্তানের দাবিতে প্রতক্ষ সংগ্রামে সামিল হয়। 
 
প্রতক্ষ সংগ্রামের বিভিন্ন কর্মসূচি : 
 মুশলিম লীগের নেতা মহম্মদ আলী জিন্না শিক্ষিত এবং সু বাচনভঙ্গির অধীকারি ছিলেন। তিনি মুশলিম জনসাধারণের Brainwash করতে শুরু করে। জনসাধারণের কাছে মুশলিম লীগের পরিকল্পনা সম্পর্কে জ্ঞাত করানো শুরু করে। মুশলিম সম্প্রদায়ের কাছে জিন্না এবং লিয়াকত আলী ছিলো ভগবানের অবতার। তাদের সব কথা পুরো মুশলিম জাতি অক্ষরে অক্ষরে পালন করতো। মুশলিম লীগ তাদের বোঝাতে শুরু করে যে পাকিস্তানের দাবি তাদের জন্মগত অধীকার তা তারা আদায় করেই ছাড়বে। তাদের মুশলমান ধর্ম সংকটের মধ্যে আছে তা তাদেরকেই রক্ষা করতে হবে। এইভাবেই কালের গভীরে হিন্দুদের সর্বনাশ বিধ্বংশী ঘূর্নাবর্তের মতো ধিরে ধিরে এগিয়ে আসছিলো। প্রত্যক্ষ সংগ্রামের জন্য ট্রাক বোঝাই করে লোক কলকাতায় জমা হতে থাকে। ট্রাক বোঝাই করে তরোয়াল, ছুরি, বন্ধুক, লাঠি, লোহার ডান্ডা আসতে থাকে। কলকাতার  তৎকালিন মেয়র সৈয়দ ওসমান খান মুশলিমদের মধ্যে লিফ্লেট প্রচার করে। ওই লিফ্লেটে তাদের পরিকল্পনা ও কর্মসূচি সম্পর্কে লেখা ছিলো। লীগ নেতা খাজা নাজিমুদ্দিন মনে করিয়ে দেয় তাদের সংগ্রাম শুরু হবে রমজান মাসে। 
জিহাদ, কাফের হিন্দুদের বিরুদ্ধে ধর্মযুদ্ধ, নির্বিচারে হিন্দু গণহত্যা। দীর্ঘ ১৮ দিন পরিকল্পনার পর ১৫ই আগষ্ট ১৯৪৬ মুশলিম লীগ বাংলাব্যাপি বন্ধের ডাক দেয় বাংলা মুখ্যমন্ত্রী সোরাবর্দী। হিন্দু মহাসভা তা ভন্ডুল করতে সচেষ্ট হয়। বাংলার গভর্নর বরোজ তার সমর্থন করে। 
সারাবর্দীর পদক্ষেপ  
হিন্দু মহাসভার সচিব শ্রী শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে মুশলিম লীগের এই কর্মসূচি ব্যার্থ করতে সচেষ্ট হন। বাংলার প্রধানমন্ত্রী তথা মুখ্যমন্ত্রী সারাবর্দী বাংলার ২৩ টি পুলিশ হেডকোয়ার্টারের ২১ টিতেই হিন্দু থানার জেনারেল কে সরিয়ে মুশলিম কর্মকর্তা নিযুক্ত করে। যদি আইনের অবনতিও হয় তা রুখতে পুলিশি কর্মকান্ড যাতে না হয়। এবং সশস্ত্র মুশলিম বাহিনী নির্বিচারে গণহত্যা চালাতে পারে। সরাবর্দী পুলিশ বিভাগের সবাই ছুটি দিয়ে নিস্ক্রিয় প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তোলে যাতে দাঙ্গা থামানো না হয়। 
কিন্তু যখন হিন্দুরা তাদের ওপর হামলা চালায় এবং মুশলিম আগ্রাসন কে দমন করতে উদ্যত হয় তখন সারাবর্দী কলকাতা জুড়ে সেনা মোতায়েন করেন। 
মুশলিমদের নির্দেশ : 
মুশলিম ন্যাশানাল গার্ডের সদস্যদের ১৬ তারিখ সকাল ৮: ৩০ এর মধ্যে মুশলিম ইন্সটিটিউট এর সামনে সমবেত হওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। এক্ষেত্রে মুশলিম গ্রন্থ “ মুশলিম শরিফ ”  থেকে একটি হদিসের উল্লেখ করলে  সেখানে বলা আছে – নবি যখন কোনো জনপদ আক্রমণ করতেন ভোর বেলাতে করতেন। ঠিক তেমনই জিহাদ শুরু হয় ভোর বেলাতে। 
হত্যালীলা : 
নবির পথ অনুসরণ করেই সশস্ত্র মুশলিম বাহিনী উন্মত্ত সৃগালের মতো প্রথম আক্রমণ করে ভোরের আলো ফোটার সাথে সাথেই মানিকতলা ব্রীজের সামনে এক নিরপরাধ গোয়ালা কে হত্যা করে। এর পর সেই বাহিনী কলকাতার হিন্দু অধ্যুষিত অঞ্চল গুলিতে আক্রমণ শুরু করে। 
ক) সকাল ৭:০০ নাগাদ আক্রান্ত হয় মানিক তলা দেশবন্ধু মিশন।
খ) সকাল ৭:৩০ নাগাদ আক্রমণ হয় বৌবাজার আর লোয়ার সার্কুলার জংশনে। এবং জিহাদি দল শিয়ালদহ এলাকায় অস্ত্র মজুত করতে শুরু করে। হিন্দু নির্দোশ ব্যাক্তিদের হত্যা করা হয়। কোনো কারণ ছাড়াই। 
গ) কেশারাম কটন মিলে ৩০০০ ওড়িয়া শ্রমিক দের হত্যা করা হয় ঘুমন্ত অবস্থাতেই। 
ঘ) বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মহানগরী এক বিভৎস হত্যালীলায় মেতে ওঠে। 
ঙ) সকাল ৮:২৫ এ টেরিবাজারে হামলা হয়।
চ) ৮:৩০ এ চিতপুর সিটি সিনেমাহলের সামনে হামলা করে জিহাদি দল।
ছ) ৯: ০০ টার সময় হামলা হয় শিয়ালদার হিন্দু এলাকা গুলিতে। 
জ) ৯:০০ এ একসাথেই হামলা হয় ওয়ার্ড ইন্সটিটিউশান স্ট্রিটে মুশলমানরা আক্রমণ করে। 
ঝ) ৯:১২ মিনিটে অনুরূপ নিশংস্রতার খবর আসে রিপন স্ট্রীট, মল্লিক বাজার এবং ওয়েলেস স্ট্রীট থেকে। 
ঞ) ৯:৩০ মিনিটে বড়তলা থানাতে কংগ্রেসের তরফ থেকে সাহায্য চাওয়া হয়নি যাতে পরিস্থিতির অবনতি না হয়। কিন্তু শহিদ হোসেন সারাবর্দী আগেই সব কর্মীদের ছুটি দিয়ে দিয়েছিল  তাই কোনো পুলিশি পদক্ষেপ গ্রহন করা হয়নি। 
ট)১০:১০ নাগাদ  উন্মত্ত জিহাদিদল দমদম রোডে হামলা চালায়। 
ঠ) ১০:২২ মিনিটে গড়পাড় এবং যোগীপাড়া লেন থেকে হামলার খবর আসতে থাকে। 
ড) ১০:৩০ এ হ্যারিশন রোড আক্রান্ত হয়।
ঢ) ১১:০৮ ঘটিকায় বিবেকানন্দ স্ট্রিটের কমলা বস্ত্রালয়ে অগ্নিসংযোগ করা হয়। 
ণ) ১১:৪৫ নাগাদ রিপন কলেজ স্ট্রিটের সামনে ভয়াবহ দাঙ্গার খবর আসতে থাকে। 
ত) ১১:৫০ ঘটিকায় খবর আসে শিয়ালদার দিকের দোকানপাট লুঠ করে একটি বিরাট দল বৌবাজারের দিকে এগিয়ে চলেছে। হাতে তরোয়াল আর মুখে হিন্দু বিরোধী স্লোগান দিতে দিতে আপার সার্কুলার রোড ধরে ময়দানের দিকে অগ্রসর হয়। 
0* এবং তৃতিয় দলটি হাতিবাগানের দিকে অগ্রসর হয়। 
থ) ১:৩০ ঘটিকা নাগাদ খবর আসে ষষ্ঠীতলাতে তারা গণহত্যা চালাচ্ছে। 
দ)  ৩:০০ নাগাদ গড়পাড়ে হিন্দুদের নির্যাতনের খবর আসে। 
এইসময় ময়দানে মনুমেন্টের নীচে মুশলমানরা জমায়েত করে। লীগের নেতৃত্বে কয়েক হাজার ধর্মোন্মাদের আশ্বস্ত করে, আজ তাদের লুঠ, ধর্ষন, হত্যার মতো নৃশংস কাজের কোনো পাপ হবে না। সরকার নিজে তার দায়িত্ব নেবে। সমাবেশ শেষ হতে না হতেই উন্মত্ত মুশলমানরা হিন্দু প্রতিষ্ঠান গুলি ধূলিস্বাত করতে থাকে। 
ধ) বিকেল ৪:০৫ নাগাদ লাইট হাউস সিনেমার পাশে ভাঙচুর চালায়।
ন) ৪:২০ তে বেঙ্গল ক্লাব আক্রান্ত হয়।
প) ৪:৩০ নাগাদ খবর আসে মেট্রো সিনেমার পাশে কে.সি. বিস্বাসের দোকান লুঠ করে অস্ত্র শস্ত্র নিয়ে গেছে মুশলিমরা। 
ভ) ৪:৪২ নাগাদ খবর আসে ধর্মতলার কমলালয় স্টোর্স সম্পুর্ন লুঠ হয়ে যায়। 
ম) ৫:১০ ঘটিকায় ধর্মতলার চাঁদনিচকে লুঠ হয়েছে। ইন্দ্র রায় রোড, আপার সার্কুলার আর মির্জাপুর রোডের রাস্তায় মুশলিম বাহিনী টহল দিচ্ছে। যত সন্ধ্যে নামতে থাকে ততই আক্রমনের তেজ বাড়তে থাকে।
 সংগ্রামের ভয়াবহতা : 
কলকাতার প্রাক্তন ডি.জি গোপালবিহারি মজুমদার তাঁর বইতে লিখেছেন “ রাত ১১টা ১২টা নাগাদ আবার ওরা আক্রমন করলো। তিনি দেখলাম একদল লোক তাদের হাতে ছোড়া, তরোয়াল ইত্যাদি নানা রকম অস্ত্র, তারা চিৎকার করে বলছে, আজতো এক এক হিন্দু কুরবানী করেঙ্গে ”। তিনি আরও লিখছেন, তিনি সবচেয়ে বেশি ভয় পেতেন মেয়েদের নিয়ে। তিনি লিখছেন হিন্দু মেয়েদের ওপর মুশলমান দের বরাবরের লোভ। 
তিনি আরও লিখছেন – রাজাবাজারের রাস্তায় যেতে যেতে তিনি দেখলেন রাস্তায় গরুকে কেটে যেভাবে ঝুলিয়ে রাখা হয়, তেমনি ভাবে হিন্দু মেয়েদের হাত পা কেটে নগ্ন দেহ চুল দিয়ে বেঁধে ঝুলিয়ে রেখেছে। তিনি লিখছেন তার প্রায় দেঢ় দিন পর্যন্ত আল্লাহো আকবর, নারায় তকবীর ধ্বনি সর্বত্র শোনা যাচ্ছিলো। মুশলিম জিহাদিদের মখে স্লোগান লড়কে লেঙ্গে পাকিস্তান – এ ব্যাপ্ত থাকত গোটা মহানগর। তারা হিন্দুদের ঘরবাড়ি গুলিতে আগুন লাগিয়ে দেয়। 
সন্ত্রাসের ভয়বহতা সম্পর্কে গোপালবিহারি মজুমদারের লেখা থেকে যে নির্মম দৃশ্য চোখের সামনে ভেসে ওঠে তা কল্পনা করলেই গা শিউরে ওঠে। গোটা কলকাতা এক নৃশংস খেলাতে মেতে উঠেছিলো। যেখানেই হিন্দুদের দেখা যাচ্ছে সেখানেই জিহাদি দল তাদের হত্যা করছে। লাখ লাখ হিন্দু সেদিন মারা যান। যেন এক নবিনতম ভয়ংকর মৃত্যু মিছিল। হিন্দুদের কী অপরাধ? তাদের কেনো হত্যা করা হচ্ছে সে বিষয়ে কেও চিন্তাই করছেনা 
 
চারি দিকে শুধু লাশ আর লাশ। মুশলিমরা এমন ভাবে নরহত্যা করতে শুরু করে যেমন তাদের হত্যাকরার license দেওয়া আছে। নদী নালা খাল বিল যুড়ে শুধু রক্ত। সেখানে জীবন্ত প্রানের অস্তিত্ব বিপন্ন হয়ে গেছিল। নারী জাতির সম্ভ্রম আজ পদদলিত। শকুনে আকাশ ছেয়ে গিয়েছিল। লাশ শেষকৃত্য করার মতোও কেওই ছিলো না। সেই মৃত্যুমিছিল পুরো দিন জুড়ে চলার পর বিকেলে প্রশাসনের পক্ষ থেকে কারফিউ জারি করা হয়। কিন্তু তাতেও সেই জিহাদি দল থেমে থাকেনি। গোটা রাত তারা এই সন্ত্রাস চালাতে থাকে। তাদের বাধা দেবার মতোও কেও ছিলো না 
হয়তো ভাগ্যদেবী হিন্দুদের জন্য এই নির্মমতাই লিখে রেখেছিল। প্রশাসন ব্যবস্থা নিশ্চুপ। তারা কোনো পদক্ষেপই গ্রহন করেনি । কিন্তু পরে হিন্দুরাই সেই জিহাদির ওপর পালটা আক্রমণ চালায়। 
হিন্দু প্রতিরোধ ব্যবস্থা :
সশস্ত্র মুশলিম জিহাদি দল যখন সারা কলকাতা জুড়ে সন্ত্রাস চালাচ্ছিল, সবর্ত যখন ত্রাহিত্রাহি রব, সেই দাঙ্গার হাত থেকে দেশ কে রক্ষা করার জন্য এক বীর যোদ্ধার আবির্ভাব ঘটে। তিনি শ্রী গোপালচন্দ্র মুখোপাধ্যায় ওরফে গোপাল পাঁঠা। এই বীর যোদ্ধা নারী জাতির সম্ভ্রম রক্ষা করতে মরিয়া হয়ে ওঠেন। শ্রী গোপাল মুখোপাধ্যায় ছিলেন বিপ্লবী অনুকুল মুখোপাধ্যায়ের ভাইপো এবং বিজয়সিং নাহারের শিষ্য। মেডিকেল কলেজের কাছে তাঁর পাঁঠা কাটার দোকান ছিলো। তাই তিনি গোপাল পাঁঠা নামেই বিখ্যাত ছিলেন। 
ইতি মধ্যে ১৭ই আগষ্ট যখন টেক্সটাইল ওয়ার্কার্স ইউনিয়নের সভাপতি সৈয়দ আবদুল্লা ফারুকির নেতৃত্বে উন্মত্ত মুশলিম বাহিনী মেটিয়াবুরুজের কটন মিলে কর্মরত হাজার শ্রমিকে হত্যা করে। দাঙ্গার নারকিয়তায় ফুঁসে ওঠে গোটা হিন্দু সমাজ। 
গোপাল পাঁঠা একদিনের মধ্যে ৮০০ হিন্দু ও শিখ যুবককে নিয়ে গঠন করে এক সশস্ত্র প্রতিবাদি বাহিনি। এই বাহিনী বীরবিক্রমে জিহাদের বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তোলে। গোপাল পাঁঠা তাদের নির্দেশ দেন যদি মুশলমানরা একজন নিরপরাধ হিন্দু কে হত্যা করে তারা যেমন ১০ জন মুশলমান কে হত্যা করে। কিন্তু তিনি এও বলেন পশুদের মতো কোনো নারী ও বাচ্চাদের ওপর কোনো আঘাত করবেনা। তিনি এক যোদ্ধার পরিচয় দিয়ে বলেন নারীর সম্ভ্রম রক্ষা করে যুদ্ধ জয় করে লাভ নেই। গোপাল পাঁঠা র বাহিনী জিহাদের পালটা আক্রমণ শুরু করে এবং মুশলমানরা পিছু হটতে থাকে। 
বিজয় সিং নাহার স্থানিয় হিন্দু যুবক দের নিয়ে গড়ে তুললেন সশস্ত্র প্রতিরোধ বাহিনী। তাঁকে সাহায্য করেন কংগ্রেসের নেতা ইন্দুভূষণ বেদ, দেবেন দে এবং ফরওয়ার্ড ব্লকের নেতা রাম চ্যাটার্জি। নারীর সম্ভ্রম রক্ষা করতে এগিয়ে আসে ১৯১৫ সালে গঠিত হওয়া হিন্দু মহাসভা। তারাও হিন্দু প্রতিরক্ষা বাহিনীর সৃজন করেন। এগিয়ে আসে কলকাতার স্থানিয় ক্লাব গুলিও। যেমন –– 
I. বাগ বাজারের জাতীয় যুব সংঘ। এবং দেশবন্ধু ব্যায়াম সমিতি।
II. বৌবাজারের হিন্দু শক্তি সংঘ এবং আর্যবীর দল।
III. হাওড়ার শালকিয়ার তরুন দল
IV. পার্ক সার্কাসের তরুন ব্যায়াম সংঘ।
V. শ্রীরাম্পুরের মিতালি সংঘ। 
হিন্দুদের পালটা আক্রমণের ফলে মুশলিম জিহাদি দল ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়ে। এবং মুশলিমদেরও বহূ প্রান হানি ঘটে। হিন্দুদের পালটা আক্রমনে মুশলিম লীগ ও ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে ওঠে। রাস্তায় পুলিশ মোতায়েন করে মুশলিম লীগ। রাস্তায় রক্তের নদী। এক সভ্যতার ধ্বংস। ঐতিহ্য মন্ডিত কলকাতা ধূলিসাৎ হয়ে যায়। 
এই ঘটনার কয়েকদিন পর শ্রী গোপাল মুখোপাধ্যায় এক সাক্ষাৎকার দেন। সেই সাক্ষাৎকারে  সেই জিহাদি দাঙ্গা এবং হিন্দু প্রতিরক্ষা নিয়ে অনেক তথ্য পাওয়া যায়। অনেক রহস্য সেখানে উদ্ঘাটিত হয়। 
তাঁকে তাঁর পার্টি সম্পর্কে জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন তিনি কোন পার্টির হয়ে লড়েননি। তিনি ডাঃ বিধানচন্দ্র রায় এর ঘনিষ্ঠ ছিলেন। তিনি বলেন, “মানুষ বিপদে পড়লে পাশে গিয়ে দাঁড়াই ”। 
তাঁর এলাকাতে আক্রমনের বিবরণ জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন — 
তাঁর বাড়ির সামনে জিহাদি দল আগুন জ্বালিয়ে দেয়। তিনি আরও বলেন “ বাড়ির মেয়েরা সব ভেতরেই ছিল। ” তাঁর বাড়ির সামনে থাকা দোকানটিতে মুশলিম দল ভেঙে লুঠ করে। তাঁর হাতে থাকা  Sword দিয়ে লুঠেরা দের একজনকে কোপ দেন। ইলেকট্রিক পোস্টে আঘাত লেগে তাঁর Sword টি ভেঙে যায়। তিনি একটা  লাঠি নিয়ে তাড়া করেন। সেখান থেকে সেই জিহাদি দল চলে যায়। 
তিনি বলেন সেই মুশলমান বাহিনী সন্ধ্যে বেলাতে আবার  Precession করে আসে। তখন পপরিস্থিতি কিছুটা শান্ত। তিনি সেখানে থাকা সিভিক গার্ডদের কাছে গিয়ে বলেন যাতে সেই বাহিনী তাঁদের এলাকাতে প্রবেশ না করে। সেই সিভিক গার্ডদের মধ্যে মুশলিমও বন্ধুও ছিল। তিনি সেই গার্ড দের বলেন ওয়েলিংটনের সামনে মুশলিম যে জমায়েতটা করছে সেটা যেমন তারা হতে না দেয়। তিনি তাঁর দুটি 4.5 পিস্তল গুলো সঙ্গে নিয়ে তিনি জমায়েত এ যান। তাঁর পাড়ার লোকেরা তাঁকে যেতে বারণ করে, সেই বারণ উপেক্ষা করে তিনি যান। তাঁর সঙ্গে তাঁর অনুগামীরও গেছিল। সেই জমায়েতে গিয়ে তিনি দেখলেন সেখানের মুশলিমরা তাঁর ওপর আক্রমণ করতে থাকে। তখন তিনি সেখান থেকে পালিয়ে আসেন। তিনি পারতেন তাঁর কাছে থাকা পিস্তল গুলো দিয়ে তাদের ওপর আক্রমণ করতে কিন্তু তিনি তা করেননি । তিনি একটা জীবনের গুরুত্ব বুঝতেন। তিনি বলেন “ পিছু হটা মানে পরাজয় নয় ”। 
তিনি লড়কে লেঙ্গে পাকিস্তান ধ্বনির ও তিব্র নিন্দা করেছেন। তিনি নির্দোশ মানুষের লাশের ওপর নতুন দেশ গঠন করাকে তিনি নিন্দা জানান।
বিখ্যাত হরেণ ঘোষ এর মৃত্যু সম্পর্কে জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন — 
তার পর তিনি খবর পান হরেণ ঘোষ মারা গেছেন। ৩৯নং মদন বড়াল লেনে তাঁর বাড়ি ছিলো। হরেণ ঘোষ সাংস্কৃতিক জগতের ব্যাক্তিত্ব। তিনি বিখ্যাত নৃত্যশিল্পী উদয় শংকর এবং অমলা শংকর এর পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। হরেণ ঘোষের অফিস ছিলো ওয়াসেল মোল্লার বড়ির দোতলাতে। মুশলিম লীগের অন্যতম নেতা এবং তৎকালিন বাংলার মুখ্যমন্ত্রী সারাবর্দী সেই বাড়িতে যেতেন এক বাইজীর কাছে। সেখান থেকে মুশলিম লীগের এই প্রতক্ষ সংগ্রামের পরিকল্পনা ফাঁস হয়ে যায়। সেই পরিকল্পনার কাগজটি পাওয়ার পর হরেণ ঘোষ সেটি জহরলাল নেহেরু কে পাঠান। এই পরিকল্পনা তে লেখা ছিলো গঙ্গার এপার অর্থাৎ মুর্শিদাবাদ, নদিয়া এবং কলকাতার কিছুটা অংশ নিয়ে গঠিত হবে হিন্দুস্থান এবং গঙ্গার ওপাড়ের অংস নিয়ে গঠিত হবে পাকিস্তান। গঙ্গা নদী দুই দেশের সীমানা হিসেবে অবস্থা করবে।  এই ঘটনার কয়েকদিন পর হরেণ ঘোষ খুন হন। 
ততকালীন পুলিশি রেকর্ড অনুযায়ী বোম্বাইয়া, বিন পেশোয়ারি নাম গুলির উল্লেখ পাওয়া যায় মুশলিম জিহাদিকে রুখার জন্য।  পুলিশি রেকর্ডে নিজের নাম সম্পর্কে গোপাল পাঁঠা মন্তব্য করেন সেই যুদ্ধে তাঁর ভূমিকা ছিলো দেশকে বাঁচানো, তাঁর জন্মভূমি পাকিস্তানের অধীনে চলে যাওয়া থেকে আটকানো। তিনি তার অনুগামী যোদ্ধাদের পরামর্শ দেন হিংসার মাধ্যমেই হিংসার সংহার করা সম্ভব। যদি মুশলমানরা একজন নিরপরাধ হিন্দুকে হত্যা করে তারা যেমন ১০জন জিহাদিকে হত্যা করে। কিন্তু কাপুরুষের মতো কোনো মুশলিম মেয়ের সম্ভ্রম নষ্ট করবেনা। 
অস্ত্রের যোগান সম্পর্কে জানতে চাওয়া হলে গোপাল পাঁঠা বলেন — জিহাদি দলের বিরুদ্ধে লড়তে হাতের কাছে যা ছিলো তা নিয়েই পালটা আক্রমণ করে। ছুরি, তরোয়াল, লাঠি, লোহার রড। ব্রিটিশ Soldiers দের ২৫০ টাকা দিলে তারা একটা ৪.৫ পিস্তল দিতো। তাদের এক বোতল হুইস্কি কিনে দিলে তারা পিস্তল আর ১০০ টা কার্তুজ দিতো। এই সব অস্ত্র নিয়ে তারা মুশলিম জিহাদি দলের বিরুদ্ধে লড়াই করে। 
তিনি সেই সাক্ষাৎকারে  আসল শত্রু নিয়ে বলেন যে সব মুশলমান রা জিহাদি আক্রমণ করতে এসেছিল তারাই শুধু আসল শত্রু আর মূলত যুদ্ধও তাদের সাথেই। তিনি বলেন নির্দোশ সওদাওয়ালাকে মেরে কী হবে?   
তিনি ও তার অনুগামী যোদ্ধারা সারাবর্দীর ওপর আক্রমণ করে। তাদের ওই attempt টা বিফলে যায়। তাদের জীপ টা skid করে ওপর থেকে রেললাইনে পড়ে যায়। সেই আঘাতে ৩জন মারা যায়। রেললাইনের ধারে পোস্টে আঘাত লেগে তাদের মৃত্যু হয়।
এই যুদ্ধে গান্ধীজী বিশেষ কোনো ভূমিকা পালন করেননি। তিনি বলেন গান্ধীজীর কাছে অস্ত্র জমা দিয়ে সার্টিফিকেট নেওয়ার কথা বলা হয়। তাঁকে দিল্লী থেকে ২ বার ডাকা হয় ওই আহ্বান তিনি প্রত্যাখ্যান করেন। ৩ বারের বেলায় তাঁর বাড়িতে আসে কলকাতার কংগ্রেসের নেতা। গোপাল মুখোপাধ্যায় কে সেই নেতা বলেন “ গোপাল মান ইজ্জত যাবে, যন্ত্রপাতি জমা দিও ”। স্থানিয় কংগ্রেসের নেতা পান্নালাল মিত্তির, জগন্নাথ কোলে, ইন্দুভূষণ বেদ প্রমুখরা তাঁর বাড়িতে আসেন। অবশেষে তিনি রাজি হন। তিনি দিল্লী যান। তিনি দিল্লী গিয়ে দেখেন সবাই ছুরি, বন্ধুক, পিস্তল জমা দেয়। তারপর তাঁকে ডাকা হয়। তাঁকে নির্মল বোস বলেন তাঁর কাছে যা অস্ত্র আছে তা জমা দিতে। তিনি এই ভয়াবহ দাঙ্গাতে গান্ধীজীর ভূমিকা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন এতোবড়ো দাঙ্গাতে গান্ধীজী কোথায় ছিলেন? তিনি সেই অস্ত্র গুলো জমা না দিলে বলেন, যে অস্ত্র দিয়ে মা বোনদের ইজ্জত রক্ষা করেছিল, মহোল্লা রক্ষা করেছেন তা তিনি জমা দিতে রাজি নন এবং তিনি বলেন একটা ছুঁচ দিয়েও যদি কাওকে মারা হয়ে থাকে তাও তিনি দিতে রাজি নন। 
অহিংস গান্ধী তাঁর এই অহিংসতার জন্য বিখ্যাত ছিলেন। যখন কলকাতাতে মুশলিম লীগ নিজের দেশ বানানোর জন্য হিন্দুদের ওপর অকথ্য আক্রমণ চালায় তখন তাঁর নেতৃত্বে কোনো উদ্যগই নেওয়া হয়নি হিন্দুদের রক্ষা করার জন্য। কিন্তু হিন্দুরা যখন জিহাদি দলের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায় তখন মুশলিম লীগ সেই পালটা আক্রমণ রুখতে রাস্তায় রাস্তায় সেনা মোতায়েন করে। হিন্দুদের পালটা আক্রমনে বহূ মুশলিমও প্রাণ হারায়। 
হায়, ওই বিধ্বংসী যুদ্ধে এক সভ্যতার পুরো ধ্বংস হয়ে যায়। যেই অঞ্চল প্রাচীন ভারতীয় সভ্যতার কেন্দ্রবিন্দু নামে বিবেচিত হতো তারাই এই যুদ্ধের পর ভারতীয় সভ্যতা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল। যে দুই ধর্ম ভাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ ছিল তারা পরস্পরের রক্তে নিজেদের ক্ষুদা নিবারণ করতে উদ্যত হয়েছিল। একধর্মের মানুষ নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির জন্য ওপর ধর্মের নিরপরাধ মানুষদের হত্যা করতেও দ্বিধা বোধ করেনি। The great Calcutta killings  অখন্ড ভারতের অখন্ডতা নষ্ট হয়ে যায় এবং ভারত বিভাজন স্বীকৃত হয়ে যায়। 
 
রাজনৈতিক আলোকে প্রতক্ষ সংগ্রাম : 
ভারতীয় ইতিহাসে অনেক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ হয়েছে। অনেক যোদ্ধা তার প্রাণ বিসর্জন দিয়েছে। অনেক নিরপরাধের জীবন নষ্ট হয়েছে। কিন্তু সেই সব যুদ্ধে প্রাচীন ভারতের অকন্ডতা বজায় ছিলো। প্রাচীন ভারতের সীমানার কোন পরিবর্তন হয়নি। কিন্তু ১৬ই আগষ্ট ১৯৪৬ সালের ওই বিধ্বংসী জিহাদি আক্রমণে প্রাচীন ভারতের অখন্ডতা বিনষ্ট হয়। ভারত মাতার দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গড়ে ওঠে এক নতুন দেশ। যেই ভূখণ্ড আগে অখন্ড ভারতের কেন্দ্রবিন্দু ছিলো। একনতুন মুশলিম রাষ্ট্র গঠিত হয়। নির্দোষ মানুষের লাশের ওপর ভীত প্রতিষ্ঠা হয় ওই নতুন মুশলিম রাষ্ট্রের। বহু মানুষ প্রাণ হারায় ওই আক্রমনে। সরকারি হিসেবে মৃতের সংখ্যা ৩০০০০ বলা হলেও সেই হামলায় প্রায় ৫০০০০ মারা যায়। ২৫০০০০ জন বেঘর হন। মানুষের মধ্যে ভীতি জন্মায়। কলকাতা ছেড়ে বহু মানুষ অন্যত্র স্থানান্তর করেন। সবার থেকে করুন পরিনতি হয় নোয়াখালীতে বসবাস করা হিন্দু দের তাদের সম্পুর্ন রূপে নিশ্চিহ্ন করা হয়। একজন হিন্দুও রেহাই পাননি সেই জিহাদি আক্রমণ থেকে।
 
ধার্মিক আলোকে The Great Calcutta Killings : 
The Great Calcutta Killings এটি প্রাচীন ভারতের ইতিহাসের এমন এক অধ্যায় যেই অধ্যায় সমাজের প্রতিটি ক্ষেত্রে নিজে প্রভাব বিস্তার করেছিল। ১৬ই আগষ্ট যে আক্রমণ হয়েছিল নির্দোষ হিন্দুদের ওপর তাকে অনেকেই মুশলিম আগ্রাসনের জিহাদি আক্রমণ বলে মনে করেছেন। যদি এটা জিহাদি আক্রমণ হয় তো এই জিহাদ নিয়েই একটু ধারণা লাভ করা যাক। এই জিহাদি কথাটি মুশলিম দের পবিত্র ধর্মগ্রন্থ কোরানে বারংবার উল্লেখ পাওয়া যায়। 
Oxford dictionary অনুযায়ী জিহাদ কথাটির দুটি অর্থ বর্তমান। 
১: প্রথম অর্থ হলো ইশলাম বিরোধীদের আক্রমণ ও যুদ্ধ। বিস্তারিত ব্যাখ্যা করলে যেটা পাওয়া যায় তা হলো যারাই তাদের ধর্মের বিরোধীতা করবে তাদেরই বিনাশ করা হবে। যদি তারা নির্দোষ ও হয় তাদের রেহাই নেই। তারা মনে করে ওপর ধর্মের মানুষরা তাদের ধর্মের পথে বাধা। তাই কাফের দের সংহার করলে তাদের শান্তি। তাই তারা জিহাদ শব্দটাকে প্রত্যক্ষ সংগ্রাম হিসেবে বিবেচনা করে। 
আলোচোক রা এই বর্ণনা কে দুটো ভাগে ভাগ করেছেন। 
a) Jihad of pen / tongue – অর্থাৎ মৌখিক বা কাগজে কলমে এবং debate এর মাধ্যমে ইশলাম বিরোধীদের সংহার। 
b) Jihad of sword – অর্থ হলো তরোয়াল বা অস্ত্র হাতে মুশলিম বিরোধী দের নির্মম ভাবে হত্যা করে আল্লাহ অনুগ্রহ লাভের জন্য সংগ্রাম। 
এই অর্থের প্রতি বিশেষ মনোযোগ দিলে দেখতে পাই এর উৎপত্তিতে ধর্মীয় মতামতের চেয়ে রাজনীতিতে হিংসাত্মক মনোভাবের উপস্থিতি অনস্বীকার্য। 
 
 
২) কিন্তু আদতে জিহাদ শব্দের অর্থ নিরপরাধ মানুষের জীবন কেড়ে নেওয়া নয়। জিহাদ শব্দের অর্থ সংগ্রাম ঠিকই কিন্তু সেই সংগ্রাম কোনো বিপরীত ধর্মের মানুষদের ওপর আক্রমণ করে নয়। জিহাদ হলো নিজের মনের মলীনতা কে দূরিভুত করে নিজের মনকে পবিত্র করার মার্গ। ইহা কোনো ররক্তক্ষয়ী সংগ্রাম নয়। এটি নিজের অভ্যন্তরীণ সংগ্রাম। নিজের মনের কলুষিতকে দুরিভুত করে মনের নিকৃষ্ট ভাবনাকে এড়িয়ে নিজেকে পুর্ন সমর্পণ। এটি জিহাদ কথার আসল মানে এটি। কিন্তু মানুষের বোধগম্য না হয়ে ১৬ই আগষ্টের সংগ্রামে বহু মানুষ নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়।
সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গিতে the great Calcutta killings :
মানুষ সামাজিক জীব। সমাজে বসবাস করে। আর সেই সমাজে জাতি ধর্ম নির্বিশেষে মানুষ বসবাস করে। সেই সমাজে যখন এক ধর্মের মানুষ ওপর ধর্মের মানুষদের ওপর অত্যাচার করে, তাদের হত্যা করে তখন সেই সমাজ আর বাসস্থানের উপযোগী থাকেনা। ১৬ই আগষ্ট ১৯৪৬ সালের ঘটনা সেই তেমনই এক সমাজকে ধ্বংস করার মতো ঘটনা। সেদিন মানুষ এতোটাই নির্মম হয়েগেছিল যে সমাজের সভ্যতার ভীত নড়ে গিয়েছিল। রক্তে পিচ্ছিল হয়ে গেছিল সভ্যতার কেন্দ্রবিন্দু। সেই ৭২ঘন্টা মানুষের জীবনের সবথেকে করুন মুহূর্তের সাখ্যি হয়েই থাকবে। সেই ঘটনার পর ভারত বিভাজন হয়। সমাজের ধ্বংস হয়। দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে বিভেদ বাড়ে। সবথেকে ভয়ংকর পরিনতি হয় নোয়াখালীতে। সেখানে এই জিহাদি আক্রমণ এতো তিব্র হয়ে ছিল যে সেখান থেকে হিন্দুদের পদচিহ্নটুকুও মুছে ফেলা হয়। 
এই ঘটনাকে সামাল দিতে গান্ধীজী বাংলাতে আসেন। কিন্তু এই রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে তিনি কী ভূমিকা পালন করেছিলেন তা নিয়ে মতভেদ আছে। তিনি ১৬ই আগষ্ট কোনো ভূমিকা পালন করেননি। তিনি ১৭ ই আগষ্ট হিন্দুদের আক্রমণ রুখতে উদ্যত হন এবং কলকাতা জুড়ে সেনার ঢল নামান। তিনি গোপাল মুখোপাধ্যায় কে অস্ত্র সমর্পণ করতে বললে তিনি শর্ত দেন যাতে কলকাতা থেকে সেনাবাহিনী সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। তিনি আরও বলেন তাঁর দেহরক্ষীরাও যেমন না থাকে। তাকে পাহারা দেবে গোপাল মুখোপাধ্যায়ের দলের লোক। সবার অনুমান করা সম্ভব হয়েছিল মুশলিম শাসিত অঞ্চলে হিন্দুদের অবস্থা কি হতে পারে।১৬ই আগষ্ট ১৯৪৬ থেকে শুরু করে তার পরবর্তি ৭২ ঘন্টার ঘটনা গুলি এই অখণ্ড ভারতের বিভাজনের পথ প্রশস্ত করে । মানুষের মনে ভয়ের বাসা বাধে। মানুষ তার স্বাভাবিক জীবন থেকে অনেক দূরে সরে যায়। অনেক মানুষ তার ভিটে মাটি ছেড়ে অন্যত্র চলে যায়। সাধারন মানুষের রক্তে রাঙিয়ে ওঠে সেদিনের কলকাতা নগরী। তাই ১৬ই আগষ্ট ১৯৪৬ দিনটি মানুষের মনে এক ভয়ংকর স্বপ্নের মতোই বাসা বেঁধে থাকবে। এইরকম ঘটনার পুনরাবৃত্তি যেমন আর না হয়। 
~সমাপ্ত~
 
Reference : 
The Communal Riots in Bengal by Suranjan Das. 
Leave a Reply