Posted on Leave a comment

সনাতন ধর্মের প্রাচীনতম ধর্মমেলা কুম্ভমেলা ও তার ঐতিহাসিক গুরুত্ব

সনাতন ধর্মের প্রাচীনতম ধর্মমেলা কুম্ভমেলা ও তার ঐতিহাসিক গুরুত্ব - সুমিত বণিক

kumbh sadhus 03

দেবভূমি ভারতবর্ষ হাজার হাজার বছর ধরে অসংখ্য মুণি, ঋষি, সন্ন্যাসী ও মহাপুরুষের জন্মস্থান। এই দেবভূমিতে এক বিশাল ধর্মসেম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় চারটি স্থানে – প্রয়াগ, হরিদ্বার, উজ্জয়িনী এবং নাসিকে। প্রতি বারে বছর অন্তর এই চারটি স্থানে পূর্ণ কুম্ভমেলা অনুষ্ঠিত হলেও প্রতি ছয় বছর অন্তর অনুষ্ঠিত হয় অর্ধ কম্ভমেলা। তুলসীদাস তাঁর রামায়ণের শুরুতেই জানিয়েছেন –

“মাঘ মরকগত রবি জব হই; 

তীরথপতিহি আর সব কোই,

 দেবদুনজ কিন্নর নরশ্রেণি;

সাদর মজ্জহি সকল ত্ৰীবেণী।” 

অর্থাৎ মাঘ মাসে সূর্য যখন মকর রাহিতে আসে, দলে দলে ভক্তগণ তখন তীর্থরাজ প্রয়াগে যান। সেই পুণ্যলগ্নে দেবতা, দানব, কিন্নর, মানব সকলেই পরম শ্রদ্ধায় ত্রিবেণীসঙ্গমে স্নান করে থাকেন। বাল্মীকির রামায়ণে যদিও এই তথ্য নেই কিন্তু আকবরের আমলে তুলসীদাসও অস্বীকার করতে পারলেন না ভিড়ে ঠাসা মাঘ মেলার ঐতিহ্য। বারো বছর অন্তর হরিদ্বার কুম্ভ, ফি বছর পৌষসংক্রান্তির গঙ্গাসাগর বা কেঁদুলি নয়, এটিই দেশের সবচেয়ে পুরনো ধর্মীয় মেলা। হরিদ্বারের কুম্ভমেলা।

প্রয়াগ ও সেখানে পবিত্র স্নানের তীর্থযাত্রার সবচেয়ে পুরানো উল্লেখ রয়েছে ঋগবেদের পরিশিষ্টতে। পালি ধর্মশাস্ত্রের অন্তর্গত মঝঝিম নিকায়ের ১.৭ নং পরিচ্ছেদে উল্লেখ আছে যে, বুদ্ধ বলেছেন প্রয়াগে অবগাহন করলেই কোনো ব্যক্তির নিষ্ঠুর ও মন্দ কাজগুলো ধুয়ে যায় না; বরং ন্যায্য কাজ ও বিশুদ্ধ হৃদয়ের দ্বারা ব্যক্তি নিজেকে চবিত্রবান করে তুলতে পারে।

মহাভারত মহাকাব্যও অতীতের ভুল ও অপরাধবোধের প্রায়শ্চিত্যের জন্য প্রয়াগে স্নানের তীর্থযাত্রার কথা উল্লেখ করেছে। মহাভারতে মহাযুদ্ধের পূর্বে তীর্থযাত্রা পর্বে উল্লেখ আছে, যে ব্যক্তি নৈতিক বা ধর্মসম্মত ব্রত পালন করে এবং মাঘ মাসে প্রয়াগে অবগাহন করে, সেই ব্যক্তি নিষ্কলুষ হয়ে ওঠে এবং স্বর্গলাভ করে। মহাযুদ্ধের পর এই মহাকাব্যের অনুশাসন পর্বে বলা হয়েছে যে, প্রয়াগের তীর্থস্নান হল ভৌগোলিক তীর্থ, যাকে সংযুক্ত করতে হবে মানসিক তীর্থের সাথে এবং এর মাধ্যমে ব্যক্তি বিভিন্ন মূল্যবোধ যেমন সত্য, দানশীলতা, আত্ম-সংযম, ধৈৰ্য্য ইত্যাদি নিয়ে জীবন অতিবাহিত করতে সক্ষম হবে। 

প্রয়াগ এবং অন্যান্য নদী তীরবর্তী স্থানে, যেখানে বর্তমানে কুম্ভমেলা অনুষ্ঠিত হয়, সেই সকল স্থানে উৎসবের উল্লেখ প্রাচীন ভারতের বহু সাহিত্যেই পাওয়া যায়। কিন্তু কুম্ভ মেলার সঠিক সময়কাল তথা বয়স অনিশ্চিত। সপ্তম শতাব্দীর চৈনিক বৌদ্ধ ভিক্ষু হিউয়েন সাঙ তার সি-ইউ-কি গ্রন্থে রাজা হর্ষবর্ধন ও তাঁর রাজধানী প্রয়াগের কথা উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেছেন যে, প্রয়াগ ছিল একটি পবিত্র হিন্দু শহর, যেখান ছিল শত শত হিন্দু মন্দির ও দুটি বৌদ্ধ প্রতিষ্ঠান। তিন নদীর সঙ্গমস্থলে হিন্দুদের অবগাহন আচারানুষ্ঠানের উল্লেখও তিনি করেছেন। কিছু পন্ডিত মনে করেন যে, হিউয়েন সাঙের বিবরণই হল কুম্ভমেলা সম্পর্কিত সবচেয়ে প্রাচীন ঐতিহাসিক বিবরণ, যা অনুযায়ী প্রয়াগের কুম্ভমেলার সময়কাল ছিল ৬৪৪ খ্রিষ্টাব্দ।

কামা ম্যাকলিন নামক একজন ভারততত্ত্ববিদ মূলত ঔপনিবেশিক মহাফেজখানা ও ইংরেজি পত্রপত্রিকার ওপর ভিত্তি করে কুম্ভমেলার ওপর বহু প্রবন্ধ লিখেছেন। সপ্তম শতাব্দীর হিউয়েন সাঙের  স্মৃতিকথার সাম্প্রতিক ব্যাখ্যা ও অন্যান্য পন্ডিদের প্রেরিত ই-মেলের ওপর ভিত্তি করে ম্যাকলিন বলেছেন যে, প্রয়াগ উৎসব সংঘটিত হত প্রতি পাঁচ বছর অন্তর (১২ বছর নয়)। সেখানে একটি বুদ্ধমূর্তি উপস্থিত থাকতো এবং তার সঙ্গে সেখানে একটি বুদ্ধমূর্তি উপস্থিত থাকতো এবং তার সঙ্গে সেখানে চলত ভিক্ষাদান কার্য। ফলে তার মতে এটি ছিল হয়ত একটি বৌদ্ধ উৎসব। পক্ষান্তরে, হিন্দু ধর্মত্ত্ববিদ এরিয়েল গ্লুকলিচ বলেছেন যে, হিউয়েন সাঙের স্মৃতিকথায় কিছুটা উপহাস্যকরভাবেই প্রয়াগের খ্যাতিকে তুলে ধরা হয়েছে, যেখানে হিন্দুরা তাদের আত্মার মুক্তির লক্ষ্যে কুসংস্কারাচ্ছন্ন হয়ে ভক্তিমূলক আত্মহত্যা করত এবং কীভাবে পুরানো দিনের এক ব্রাহ্মণ শেষপর্যন্ত এই অসৎ আচরণকে কার্যকরীভাবে বন্ধ করেন। এই ঘটনা এবং মন্দির ও অবগাহন জলাশয় সংক্রান্ত অন্যান্য বিবরণী ইঙ্গিত দেয় যে, সপ্তম শতাব্দীর প্রয়াগের হিন্দু আচরণবিধিগুলিকে হিউয়েন সাঙ তার বৌদ্ধ দৃষ্টিভঙ্গীতে উপস্থাপন করেছেন। গ্লুকলিচ বলেছেন যে, হয়ত এই বর্ণনার দ্বারা হিউয়েন সাঙ তার চৈনিক পাঠকবর্গের মনোরঞ্জন করতে চেয়েছিলেন।

হিন্দু ধর্মে প্রয়াগের গুরুত্ব সম্পর্কিত তথ্য প্রয়াগ মাহাত্ম’-র বিভিন্ন সংস্করণে, যার সময়কাল হল খ্রীষ্টিয় প্রথম সহস্রাব্দের শেষদিক। এই পুরাণ-ধারার হিন্দু রচনাগুলি বর্ণনা দিয়েছে যে, প্রয়াগ হল এমন একটি স্থান যা পুণ্যার্থী, পুরোহিত, বিক্রেতা, ভিক্ষুক, পথপ্রদর্শক প্রমুখকে নিয়ে শশব্যস্ত এবং স্থানীয় অধিবাসীরা নদীর সঙ্গমস্থলে অবগাহনে ব্যস্ত। মধ্যযুগীয় ভারতের এই সংস্কৃত পথপজিগুলির বিভিন্ন সংস্করণে পুরোহিত ও উপদেষ্টারা আধুনিক রূপ দান করতে থাকে, পরিদর্শক পুণ্যার্থীদের সাথে যাদের অর্থনৈতিক স্বার্থ জড়িত ছিল। প্রয়াগের নদীসমূহ এবং হিন্দু তীর্থযাত্রায় তাদের গুরুত্ব সম্পর্কিত এক সুদীর্ঘ বিবরণ মৎস পুরাণের ১০৩-১১২ নং অধ্যায়ে লিপিবদ্ধ আছে।

ষোড়শ শতাব্দীর ‘রামচরিতমানস’-এর রচয়িতা তুলসীদাস প্রয়াগে একটি বাৎসরিক মেলার উল্লেখ করেছেন। আকবরের রাজত্বকালে ‘আইন-ই-আকবরী’-র রচয়িতা আব্দুল ফজলও প্রয়াগ মেলার উল্লেখ করেছেন (১৫৯০ সালে)। আইন-ই-আকবরী প্রয়াগকে বলেছে হিন্দুদের ‘মন্দিরের রাজ্য’ এবং উল্লেখ করেছে যে এই প্রয়াগ নগরী হিন্দু মাঘ মাসে বিশেষভাবে পবিত্র বলে বিবেচিত হয়। ষোড়শ শতাব্দীর শেষ দিকে রচিত ‘তবাকত-ই-আকবরী’ গ্রন্থটিও প্রয়াগ সঙ্গমে একটি বাৎসরিক অবগাহন উৎসবের কথা জানিয়েছে, যেখানে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের হিন্দুরা পবিত্র স্নান করতে আসত এবং তাদের সংখ্যা এতটাই বেশি ছিল যে প্রয়াগের পাশ্ববর্তী বনভূমি ও সমভূমিতেও তাদের স্থান সংকুলান সম্ভব হত না।

পরবর্তী মুঘল যুগের কিছু গ্রন্থ যেমন খুলাসৎ-উৎ-তারিখ (১৬৯৫-৯৯ খ্রি.) এবং চাহার গুলসন (১৭৫৯ খ্রি.) প্রভৃতি হরিদ্বারের কুম্ভমেলার উল্লেখ করেছে। খুলাসৎ-উৎ-তারিখ গ্রন্থটি এলাহাবাদে একটি বাৎসরিক অবগাহন তীর্থ উৎসবের কথা বলেছে কিন্তু সেই উৎসবের নাম ‘কুম্ভ’ বলেনি। মুঘল যুগের এই দুটি গ্রন্থই শুধুমাত্র হরিদ্বারের মেলাটিকেই ‘কুম্ভ মেলা’ বলে উল্লেখ করেছে এবং বলেছে যে প্রয়াগ ও নাসিকেও অনুরূপ মেলা আয়োজিত হত। খুলাসৎ-উৎ-তারিখে নিম্নলিখিত মেলার একটি তালিকা পাওয়া যায় –

ক) হরিদ্বারে একটি বাৎসরিক মেলা এবং ১২ বছর অন্তর একটি কুম্ভ মেলা। | 

খ) ত্রিম্বক-এ আয়োজিত একটি মেলা (বৃহস্পতি যখন সিংহরাশিতে প্রবেশ করে অর্থাৎ ১২ বছরে একবার)

গ) প্রয়াগে মাঘ মাসে আয়োজিত একটি বাৎসরিক মেলা।

এলাহাবাদে প্রাপ্ত সম্রাট অশোকের একটি স্তম্ভলিপি পাওয়া গিয়েছে যেখানে খ্রিষ্টপূর্ব তৃতীয় শতাব্দী থেকে শুরু করে মধ্যযুগ পর্যন্ত বহু লিপি উল্কীর্ণ আছে। ১৫৭৫ খ্রীষ্টাব্দ নাগাদ কোনো এক সময় সম্রাট আকবরের সভাসদ বীরবল এই স্তম্ভে একটি লিপি উৎকীর্ণ করেন যেখানে প্রয়াগ তীর্থরাজে মাঘ মেলার উল্লেখ আছে।

বর্তমান কালের চারটি কুম্ভ মেলার মধ্যে প্রয়াগের মাঘ মেলাই সম্ভবত সবচেয়ে প্রাচীন। এর সূচনাকাল ছিল সম্ভবত শুরুর দিকে কয়েক শতাব্দীর মধ্যে  কোনো এক সময়কাল। বেশকিছু প্রাচীন পুরানে এর উল্লেখ আছে। তবে এইসব প্রাচীন অবগাহন তীর্থক্ষেত্রগুলির ‘কুম্ভ’ নামকরণ হয়েছিল সম্ভবত উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময় নাগাদ। এস. পি. দুবে বলেছেন যে, প্রাচীন কালের কোনো হিন্দু সাহিত্যই প্রয়াগের মেলাকে ‘কুম্ভ মেলা’ বলেনি। কামা ম্যাকলিন বলেছেন যে, ব্রিটিশ শাসনের গোড়ার দিকে কোনো নথিপত্রই ‘কুম্ভ মেলা’ বা ১২ বছর চক্রের প্রয়াগ মেলার নাম উল্লেখ করেনি। প্রয়াগের কুম্ভ মেলার প্রথম ব্রিটিশ উল্লেখ পাওয়া যায় তাদের ১৮৬৮ সালের প্রতিবেদনে, যেখানে বলা হয়েছিল, ১৮৭০ সালে জানুয়ারিতে যে কুম্ভ মেলা অনুষ্ঠিত হবে তার জন্য বিপুল পুণ্যার্থী ও তাদের স্বাস্থ্যবিধান নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা করা উচিত। ম্যাকলিনের মতে, প্রয়াগের প্রয়াগবাল ব্রাহ্মণ পুরোহিতরা উনিশ শতকের সামাজিক-রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে প্রয়াগের বাৎসরিক মাঘ মেলার সঙ্গে ‘কুন্ত’ কিংবদন্তীকে জুড়ে দিয়েছিল।

উজ্জয়িনিতে কুম্ভ মেলার সূচনা হয়েছিল অষ্টাদশ শতাব্দীতে যখন মারাঠা শাসক রানাজি সিন্ধে উজ্জয়িনিতে একটি আঞ্চলিক উৎসব আয়োজনের লক্ষ্যে নাসিক থেকে সন্ন্যাসীদের আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। প্রয়াগের পুরোহিতদের মত নাসিক ও উজ্জয়িনতির পুরোহিতেরাও অন্যান্য অঞ্চলের মত পবিত্র অবস্থান অর্জনের তাগিদে তাদের প্রাক বিদ্যমান মাঘ মেলার সাথে কুম্ভ ঐতিহ্যকে জুড়ে দিয়েছিল।

কুম্ভ মেলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিশিষ্ট দিক হল সাধু-সন্ন্যাসীদের শিবির ও তাদের শোভাযাত্রা। অষ্টাদশ শতাব্দী নাগাদ এই সন্ন্যাসীরা নিজেদের ১৩টি আখারাতে সংগঠিত করে। আখারা বলতে বোঝায় যোদ্ধা তপস্বী গোষ্ঠী। এদের মধ্যে সাতটি আখারা শৈবধর্ম, তিনটি বৈষ্ণবধর্ম, দুটি উদাসী এবং একটি নির্মল ধর্মের সঙ্গে সংযুক্ত। শৈব ও বৈষ্ণব ধর্মের দশটি আখারা ‘দশনামী’ বলে পরিচিত। তারা বিশ্বাস করেন যে, ভারতীয় উপমহাদেশের বিভিন্ন প্রান্তের হিন্দু মঠগুলি থেকে আগত সন্ন্যাসীদের মধ্যে দার্শনিক আলোচনা ও বিতর্কের জন্য গুরু শংকরাচার্য অষ্টম শতাব্দী নাগাদ কুম্ভমেলার আয়োজন করেছিলেন। তবে তাদের এই মতের স্বপক্ষে যথেষ্ট সাক্ষপ্রমাণ নেই। যাইহোক, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর শাসনের পূর্ব পর্যন্ত এই আখারাগুলিই কুম্ভমেলা পরিচালনা করত। তারাই যুক্তিপূর্ণ ব্যবস্থাপনা, পুলিশি ব্যবস্থা, বিরোধের মধ্যস্থতা, বিচারকার্য, শুল্ক আদায় প্রভৃতি কাজগুলি পরিচালনা করত। আধ্যাত্মিক পথ প্রদর্শন ও দার্শনিক জ্ঞান লাভের জন্য মূলস্রোতের হিন্দুদের কাছে তারাই ছিল আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু। কুম্ভমেলা ছিল তাদের দীক্ষা ও নিয়োগের ক্ষেত্রভূমি এবং একইসঙ্গে ব্যবসা বাণিজ্য পরিচালনার ক্ষেত্র। হিন্দু নাগা সন্ন্যাসী ঐতিহ্যের শেকড়ও এই আখারা ব্যবস্থার মধ্যেই নিহিত রয়েছে। কোনো আখারা সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত নয় এমন বহু স্বতন্ত্র সন্ন্যাসীদেরও কুম্ভ মেলা আকৃষ্ট করে।

ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর শাসন প্রতিষ্ঠার ৩০ বছর পর ১৭৯৬ সালে ক্যাপ্টেন থমাস হার্ডইউকের লেখা হরিদ্বারের কুম্ভমেলা সম্পর্কিত একটি বিবরণী প্রকাশিত হয়েছিল। হিন্দু যোগ পান্ডুলিপি ও হিন্দু মঠ প্রতিষ্ঠানের বিশেষজ্ঞ জেমস ম্যালিনসন বলেছেন যে, প্রয়াগের অবগাহন উৎসব এবং বিপুল তীর্থযাত্রীদের সমাবেশ সংক্রান্ত তথ্য খ্রিষ্টিয় প্রথম সহস্রাব্দের মাঝামাঝি সময় থেকেই পাওয়া যায়, যেখানে অন্যান্য নদীর তীরবর্তী পবিত্র তীর্থস্থান সম্পর্কিত সাহিত্যিক প্রমাণ পাওয়া যায় মধ্যযুগ থেকে। অষ্টাদশ শতাব্দী নাগাদ বিভিন্ন সন্ন্যাসী গোষ্ঠীর মধ্যে নিরন্তর সংঘর্ষ, যোদ্ধা সন্ন্যাসীদের যুদ্ধং দেহী মনোভাব, লাভজনক শুল্ক ও ব্যবসায়িক সুযোগ প্রভৃতি কারণে ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর কর্মকর্তারা কুম্ভ মেলার প্রতি আকৃষ্ট হয়। এরপর থেকে তারা মেলায় হস্তক্ষেপ করে, শিবির স্থাপন করে, ব্যবসায়িক জায়গা প্রতিষ্ঠা করে এবং প্রতিটি আখারার জন্য নির্দিষ্ট অবগাহন ক্রম প্রতিষ্ঠা করে।

বিভিন্ন আঞ্চলিক নাম নিয়ে অতীতের এই কুম্ভমেলাগুলি বিপুল পরিমাণ তীর্থযাত্রীদের আকৃষ্ট করেছে এবং শত শত বছর ধরে হিন্দুদের কাছে এগুলি ধর্মীয়ভাবে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। এই কুম্ভমেলা হিন্দুদের কাছে ধর্মীয় উৎসবের থেকেও অনেক বেশি কিছু। ঐতিহাসিকভাবে কুম্ভ মেলাগুলি ছিল গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক কেন্দ্র, আখারাগুলিতে নতুন সদস্যদের দীক্ষা কেন্দ্র, প্রার্থনা ও গোষ্ঠী সংগীতের কেন্দ্র, আধ্যাত্মিক আলোচনা ও শিক্ষাকেন্দ্র এবং বিভিন্ন প্রদর্শনীর কেন্দ্র। ঔপনিবেশিক যুগে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী ও তার কর্মচারীরা ‘তীর্থ কর’ বাবদ হিন্দু তীর্থক্ষেত্রগুলি থেকে বিপুল রাজস্ব সংগ্রহ করত এবং মেলায় অনুষ্ঠিত ব্যবসাবাণিজ্য থেকেও তাদের আয় ছিল ব্যাপক। ১৮৩৪ সালে লক্ষ্ণৌ-এ রচিত মুসলিম বিশ্বকোষ ‘ইয়াদাগার-ই-বাহাদুরি’ প্রয়াগ উৎসব এবং হিন্দুদের কাছে তার পবিত্রতা ব্যাখ্যা করেছে। এস. পি. দুবে বলেছেন যে, ব্রিটিশ কর্মচারীরা শুল্কের পরিমাণ গড় মাসিক আয়ের থেকেও বেশি বাড়িয়ে দেয় ফলে তীর্থযাত্রীদের আগমণ বহুলাংশে কমে যায়। ১৯৩৮ সালে লর্ড অকল্যান্ড তীর্থকর বিলুপ্ত করেন ফলে আবার বিপুল সংখ্যায় পুণ্যার্থীদের আগমণ ঘটে।

ব্যাপটিস্ট মিশনারি জন চেম্বারলিন, যিনি ১৮২৪ সালে হরিদ্বারে অর্ধ কুম্ভমেলা পরিভ্রমণ করেছিলেন, তিনি বলেছেন যে, মেলায় বিপুল সংখ্যক মানুষ বাণিজ্যিক স্বার্থে এসেছিল। ব্রিটিশ সিভিল সারভেন্ট রবার্ট মন্টেগোমারি মার্টিনের ১৮৫৮ সালে লেখা এক বিবরণ অনুযায়ী হরিদ্বার কুম্ভ মেলায় আগত দর্শনার্থীরা ছিল বিভিন্ন প্রদেশ ও বিভিন্ন জাতির লোক। পুরোহিত, সৈনিক ও ধর্মীয় ভিক্ষুদের পাশাপাশি বুখারা, কাবুল, তুর্কিস্থান, আরব এবং পারস্য থেকে অশ্ব ব্যবসায়ীরাও মেলায় এসেছিল। মেলাতে খাদ্যশস্য, মিঠাই, বস্ত্র, খেলনা ও অন্যান্য সামগ্রীর পথপার্শ্ব ব্যবসায়ীরাও ছিল। হাজার হাজার তীর্থযাত্রী বিভিন্ন রকম পরিবহনের মাধ্যমে, কেউ বা পায়ে হেঁটে, রঙিন পোষাকে সজ্জিত হয়ে আবার কেউ বা নগ্ন দেহে ‘মহাদেব বল, বল বল’ ধ্বনি তুলে চিৎকার করে তীর্থক্ষেত্রে অগ্রসর হচ্ছিল। রাত্রিবলো নদীতট এবং শিবিরগুলো তৈলবাতিতে উদ্ভাসিত হচ্ছিল, নদীর ওপর আতশবাজির বিস্ফোরণ হচ্ছিল এবং পুণ্যার্থীদের পরিবেশিত অগনিত ভাসমান বাতি নদীর স্রোত বরাবর চালিত হচ্ছিল। বেশ কয়েকজন হিন্দু রাজা, শিখ শাসক এবং মুসলিম নবাব মেলা ভ্রমণ করেছিলেন। ইউরোপীয়রা জনসমাবেশ দেখতেন এবং কিছু খ্রিষ্টান মিশনারীরা তাদের ধর্মীয় সাহিত্য হরিদ্বার মেলায় বিতরণ করতেন।

ঔপনিবেশিক নথিপত্র অনুসারে কুম্ভমেলার সঙ্গে যুক্ত প্রয়াগবাল সম্প্রদায় ছিল তাদের মধ্যে একজন যারা ঔপনিবেশিক সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের বীজ বপন করেছিল এবং ১৮৫৭ সালের বিদ্রোহকে স্থায়িত্ব দিয়েছিল। ঔপনিবেশিক সরকারের সমর্থনপুষ্ট খ্রিষ্টান মিশনারী ও কর্মচারীরা যারা প্রয়াগবাল সম্প্রদায় ও তীর্থযাত্রীদের ‘অজ্ঞ ধর্মানুরাগী’ বলে বিবেচনা করে আগ্রাসীভাবে তাদের ধর্মান্তরিত করার চেষ্টা করে, প্রয়াগবাল সম্প্রদায় তাদের বিরোধিতা করে এবং তাদের বিরুদ্ধে প্রচার চালায়। ১৮৫৭ সালে বিদ্রোহের সময় কর্ণেল নীল কুম্ভ মেলার ভূমিকে লক্ষ্যবস্তু করে এবং প্রয়াগবাল সম্প্রদায়ের বাসভূমিতে গোলাবর্ষণ করে তাদের বিপর্যস্ত করে। ম্যাকলিন এই ঘটনাকে এলাহবাদের ‘কুখ্যাতিপূর্ণ পাশবিক শান্তিস্থাপন’ বলে বর্ণনা করেছেন। প্রয়াগবাল সম্প্রদায় এলাকাহাবাদের মিশনারীদের ছাপাখানা ও চার্চগুলিকে লক্ষ্যবস্তু করে ও ধ্বংস করে। এরপর ব্রিটিশরা যখন অঞ্চলটির নিয়ন্ত্রণ ফিরে পেল, তখন ব্রিটিশ কর্মচারীরা প্রয়াগবাল গোষ্ঠীর মানুষদের কারারুদ্ধ করে, নির্যাতন করে এবং ফাসিতে ঝোলায়। গঙ্গা-যমুনার সংগমস্থলে কুম্ভ মেলাক্ষেত্রের বিপুল ভূ-ভাগ ব্রিটিশ সরকার বাজেয়াপ্ত করে এবং তা সরকারী সেনানিবাসের অন্তর্ভূক্ত করে। ১৮৫৭ সালের পরবর্তী কয়েক বছর প্রয়াগবাল ও মেলার অন্যান্য তীর্থযাত্রীদল বিদ্রোহ ও জাতিগত নিপীড়ণের ইঙ্গিতবাহী চিত্রযুক্ত বিভিন্ন পতাকা বহন করত। ১৮৫৭-র পরবর্তী কুম্ভ মেলায় তীর্থযাত্রীদের এই সমবেশ ও প্রতিবাদগুলোকে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম আশ্চর্যজনকভাবে ‘শত্রুতাপূর্ণ’ ও ‘অবিশ্বাসী’ বলে বিবৃত করে। আমনা খালিদ-এর মতে, ১৮৫৭-র পর কুম্ভ মেলাগুলি সামাজিক ও রাজনৈতিক সংহতিসাধনের ক্ষেত্র হিসেবে উদিত হয় এবং ব্রিটিশ সরকারও মেলার মধ্যে এইসব অগ্রগতি পর্যবেক্ষণের জন্য উৎসাহী হয়ে ওঠে। ব্রিটিশ সরকার তৃণমূলস্তরে তথ্য সংগ্রহের জন্য মেলাতে পুলিশ মেতায়েন করে। ব্রিটিশ কর্মচারীরা দেশীয় পুলিশদের সহায়তায় মেলার পরিকাঠামো উন্নয়নের জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপও গ্রহণ করে।

ভারতবর্ষের জাতীয়তাবাদী আন্দোলনেও কুম্ভ মেলার ভূমিকা ছিল বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। কুম্ভ মেলা ছিল এমন একটি ক্ষেত্র যেখানে দেশীয় মানুষ এবং রাজনীতিবিদরা নির্দিষ্ট মেয়াদ অন্তর বিপুল সংখ্যায় একত্রিত হতেন। ১৯০৬ সালে প্রয়াগের কুম্ভ মেলায় মদন মোহন মালব্যের নেতৃত্বে সনাতন ধর্ম সভার অধিবেশন বসে এবং সেখানে বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সংকল্প গৃহীত হয়। একইসঙ্গে হিন্দুত্ব রাজনীতি ও আন্দোলনের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র হল কুম্ভ মেলা। ১৯৬৪ সালে হরিদ্বার কুম্ভ মেলায় ‘‘বিশ্ব হিন্দু পরিষদ’ গঠিত হয়।

উপসংহারে বলা যায় যে, কুম্ভ মেলা হল বিশ্বের বৃহত্তম ধর্মীয় উৎসব। কুম্ভ উৎসবের অন্যতম মহিমা হল ভ্রাতৃত্ববোধ ও প্রেমের অনুভূতি, যেখানে লক্ষ লক্ষ পুণ্যার্থী ত্রিবেণীসঙ্গমে সমবেত হয় এবং নিজেদের মধ্যে ঐক্য ও ঐতিহ্যের অনুভূতি ভাগ করে নেয়। কুম্ভ মেলার চারিদিকে শুধু কালো মাথার ভিড়। মাঝে পবিত্র নগ্নতা। সর্বত্যাগী সাধু-সন্ন্যাসীর দল, যাদের পরনে শুধুমাত্র কৌপিন। সর্বাঙ্গে বিচিত্র উল্কি, ছাইভস্ম-মাখা শরীর। বিচিত্র জটাজুটের কেশবিন্যাসে তাদের বিচিত্র বর্ণের উদ্দাম মিছিল আর তাদের পরশ পেতে উদগ্রীব তরুণ-তরুণী থেকে বৃদ্ধ-বৃদ্ধা। এ কি নিছকই অন্ধ ধর্মবিশ্বাস, নাকি নিজের ভিতরের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ভারত-আত্মাকে খুঁজে পাওয়ার এক অমোঘ প্রচেষ্টা? যে প্রচেষ্টার টানে সাড়া দিয়ে কত নাস্তিকও ডুব দিয়ে গিয়েছেন এই কুম্ভে। এটাই হয়তো কুম্ভ মেলার মাহাত্ম, যা দেখে ১৩৫ বছর আগেই মুগ্ধ হয়েছিলেন মার্ক টোয়েন। মানুষ এখানে তার বিশ্বাসে ভর করে নিঃসঙ্কোচে প্রকাশ করে তার পাপ। নিজের মৃত্যু কামনা করে মোক্ষলাভের উদ্দেশ্যে। লক্ষ লক্ষ মানুষ একসঙ্গে একমনে করে মুক্তির প্রার্থনা। সকলের মন একসূত্রে বাঁধা। এ এক মনের মেলা, কোটি কোটি মানুষের মন যেখানে মিশে যায়, সেটাই সঙ্গম।

গঙ্গার কাছে সবাই সমান। গঙ্গার এই মেলা মিলিয়ে দেয় ধনীর সঙ্গে দরিদ্রকে, সর্বত্যাগী সন্ন্যাসীর সঙ্গে এক সংসারীকে। এই মেলাকে ঘিরে জমে ওঠে ধর্ম, রাজনীতি ও পর্যটন ব্যবসা।

পতিতোদ্ধারিনী কুম্ভমেলা ভারতীয় ঐতিহ্য, ভক্তি ও সংস্কৃতির অন্যতম ধারক ও বাহক। দেশে বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্যের এক অনন্য নজির কুম্ভমেলা। কুম্ভমেলা ছাড়া গোটা বিশ্বের আর কোথাও একটি মাত্র বিশ্বাসকে পাথেয় করে এত বেশি সংখ্যায় জনসমাগম হয় না। তাই কুম্ভমেলাকে সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের মর্যাদা দিয়েছে ইউনেস্কো। সঙ্গমতীরে রাতের কুম্ভ যেন এক টুকরো পুরানগ্রন্থ, যা পাঠ করতে হয় বার বার। তবু স্বাদ মেটে না।

তথ্যসূত্র :

  1. Maclean, Kama (2008). Pilgrimage and Power : Kumbh Mela in Allahabad, 1765-1954.
  2. Kane, P.V. (1953). History of Dharmasastra : Ancient and Medieval Religious and Civil Law in India.
  3. Singh, Deepak Kumar. Kumbh Mela : A Dip to Salvation. Winsome Book India Publishers.
  4. Tully, Mark (2002). The Kumbh Mela. Indica Books.
  5. Roy, Dilip Kumar; Devi Indira (1955). Kumbha : India’s ageless Festival. Bharitiya Vidya Bhavan.
  6. Krishnaswamy, C.S.; Ghosh, Amalananda (1935). A note on the Allahabad Pillar of Ashoka. The Journal of Royal Asiatic Society of Greet Britian and Ireland.



লেখক পরিচিতি

সুমিত বণিক 

প্রাক্তন বিদ্যার্থী, স্নাতকোত্তর বিভাগ, প্রাচীন ভারতের ইতিহাস 

উত্তরবঙ্গ বিশ্বাবিদ্যালয়

Leave a Reply