Posted on Leave a comment

হিন্দু জাতীয়তাবাদ এবং শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়

হিন্দু জাতীয়তাবাদ , হিন্দু ইতিহাস এবং শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায় - সুমন ব্যানার্জী

১.
   শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়’র ইতিহাস মর্মরিত আখ্যানগুলি মর্মমূলে ছিল রোম্যান্স ও রোম্যান্টিকতা দুইই। কিন্তু তাঁর অদ্বিতীয় উদ্দেশ্য ছিল হিন্দু জাতীয়তাবাদী চিন্তার  পুনরুদ্ধার ও বিস্তার।ঠিক সেই কারণেই তিনি ইতিহাসকে বিষয়াবলম্বন করেছিলেন। তাঁর অগ্রজ বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ছিলেন এক্ষেত্রে তাঁর প্রেরণার অদ্বিতীয় উৎস।যিনি বাঙালির প্রকৃত ইতিহাস চেতনাহীনতার জন্য দুঃখ প্রকাশ করেছিলেন।
 
      এখানে ‘পুনরুদ্ধার’ শব্দটি খুব সচেতনভাবেই ব্যবহার করছি। স্বাধীনতা উত্তর পর্বে বিশেষত ষাটের দশক থেকে আমাদের সাহিত্যে জাতীয়তাবাদ বিষয়টিকে অত্যন্ত লঘু ও কিছুটা তির্যক ভঙ্গিতেই দেখা হয়েছে।ইতিহাসের নির্মম সত্যগুলোকে ঢাকা দিয়ে এক রকম মেকি সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির গল্প শোনানো হয়েছে। এবং এই গোটা প্রক্রিয়ার মূলে ছিল বামপন্থী দলগুলির আন্দোলন।বস্তুত তত্ত্ব চিন্তা ও শিক্ষার জগতের ওপর তাঁদের আধিপত্য বাড়তে থাকে ; অদ্যাবধি যার ইতরবিশেষ পরিবর্তন হয়নি।এর ফল স্বরূপ হিন্দুধর্ম সম্বন্ধে চূড়ান্ত নেতিবাচক ধারণা পরিকল্পিতভাবে তৈরি করা হয় এবং তথাকথিত শ্রেণি সংগ্রামের দর্শন জাঁকিয়ে বসে।আমাদের নিজস্ব সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও জাতীয়তাবাদী চিহ্নগুলি প্রজন্মের পর প্রজন্মের মন থেকে লুপ্ত হতে থাকে।

    অথচ ঊনবিংশ শতকে জাতীয়তাবাদী চিন্তা ও আন্দোলনের তত্ত্বগত ভিত্তি ছিল ধর্মই। আরও নির্দিষ্ট করে বললে সনাতন হিন্দু ধর্ম।যার মধ্যেই বহুত্ববাদী চিন্তার শাখা প্রশাখা নিহিত। কিন্তু সমস্যার বিষয়টা হল ভারতে ইসলামী শক্তির আক্রমণ, নিরবচ্ছিন্ন শাসন ও লুঠ হওয়া সত্ত্বেও হিন্দু শাসকগণ ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারেনি।কারণ আমাদের সমাজ ছিল জাতপাতে শতধাবিভক্ত , অন্যদিকে পারস্পরিক ঈর্ষা।

    এতকিছুর মাঝেও বেশ কিছু হিন্দু শাসক বিচ্ছিন্ন ভাবে হলেও ইসলামী শক্তির আগ্রাসনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ, সঙ্ঘবদ্ধ না হলেও, গড়ে তুলেছিলেন। কিন্তু এইসব বীরত্বের কাহিনীগুলি বস্তুত যে সব কাহিনী দেশ ও জাতির প্রতি শ্রদ্ধাশীল ও ভালোবাসতে শেখাবে তা ইতিহাস থেকে ধীরে ধীরে সরিয়ে দেওয়া হয়।কিংবা লঘু করে দেখা হয়। শরদিন্দু’র প্রতিবাদ ছিল ঠিক এখানেই। তিনি সৃষ্টিশীল সাহিত্যের মধ্যে দিয়ে হিন্দু শাসকদের ও ভারতের সাংস্কৃতিক গৌরবময় সেইসব বীরত্বের কাহিনী ও কিংবদন্তিগুলিকে তুলে ধরতে চেয়েছিলেন।বলা বাহুল্য যে তিনি ইতিহাস লিখতে বসেননি।তিনি স্রষ্টা কাজেই অতিশয়োক্তি ও অতিরঞ্জন সেখানে আছেই। কিন্তু অন্ধত্ব নেই। এই কাজ নিঃসন্দেহে ছিল দুঃসাহসিক ও ব্যতিক্রমী।কারণ তিনি কোন সহযাত্রী তিনি পাননি।

২.
     ইসলামী শাসনকালকের প্রেক্ষাপটে রচিত তাঁর একটি গল্পকে আমরা এই আলোচনার ধৃতিকেন্দ্রে রাখব।গল্পটির নাম ‘রেবা রোধসি’।

     গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র হল রাজপুত্র তূণীরবর্মা।ন্যূনাধিক সাত শত বছর আগে নর্মদার উত্তর তীরে মহেশগড় নামক রাজ্য ছিল।সেই রাজ্যের রাজা হলেন শিববর্মা। তাঁর সাতজন মহিষী, পুত্র সংখ্যা ত্রিশের ঊর্ধ্বে।নিয়মানুসারে জ্যেষ্ঠপুত্রই সিংহাসনে অভিষিক্ত হন।ফলত বাকি পুত্রদের কোন কাজ থাকে না।তূণীরবর্মা হলেন শিববর্মার তৃতীয় মহিষীর গর্ভজাত চতুর্থ সন্তান। তাঁর শাসক হবার কোন সম্ভাবনা ছিল না।কাজেই আবাল্য আমোদ প্রমোদ , চরম বিলাস ব্যাসনেই তিনি কালাতিপাত করতেন –

“তাঁহার আকৃতি যেমন সুন্দর , দেহ তেমনই বলশালী , তাঁহার প্রতিকূলতা করিতে কেহ সাহস করে না ; উৎসর্গীকৃত বৃষের ন্যায় তিনি স্বচ্ছন্দচারী হইয়া উঠিলেন।ভোগব্যসনে তাঁহার রুচি রাজকবি ভর্তৃহরির পন্থা অবলম্বন করিল।জীবনে ভোগ্যবস্তু যদি কিছু থাকে তবে তাহা মৃগয়া এবং নারীর যৌবন।”

তূণীরবর্মা এক অমার্জনীয় অপরাধ করলেন : জনৈক বৃদ্ধ ব্রাহ্মণের তরুণী ভার্যাকে অপহরণ করলেন। স্বাভাবিকভাবেই মহারাজ এই চরম নীতিগর্হিত কাজের জন্য যারপরনাই ব্যথিত ও ক্রুদ্ধ হলেন। এবং পুত্রকে প্রথমে কারারুদ্ধ ও তারপর নির্বাসনের নির্দেশ দিলেন।তূণীরবর্মার ভাই ও যুবরাজ ইন্দ্রবর্মা নগরের দূর সীমান্তে তূণীর’কে ছেড়ে দিয়ে এলেন।স্নেহশীল ইন্দ্রবর্মা ভাইকে একটি অশ্ব ও কোষবদ্ধ তরবারি প্রদান করলেন। এবং বললেন যে তুমি ক্ষত্রিয়, ভুজবলই তোমার ভাগ্য।আর কখন এই রাজ্যে প্রত্যাবর্তন করো না। কিন্তু মাঝেমধ্যে ‘মাতৃভূমিকে স্মরণ কোরো’। কিন্তু এই মাতৃভূমির মর্ম কী তা তখনও বোধগম্য হয়নি চরম ভোগে লিপ্ত তূণীরবর্মার কাছে।সে দস্তুর মত ব্যঙ্গহাস্যে বলল যে – ” ‘মাতৃভূমি ! মহেশগড় আমার মাতৃভূমি নয়, বিমাতৃভূমি। এখানে সবাই আমার শত্রু।যদি কোনও দিন ফিরে আসি, একা ফিরব না, এই তরবারি হাতে নিয়ে ফিরে আসব।’ ”

    আসলে একরকম অভিমান ও জেদ থেকেই এই কথা সে বলেছিল।এই কথা সে রাখতে পারেনি।সে সশ্রদ্ধ চিত্তেই ফিরে এসেছিল।

৩.
    তূণীরবর্মা একাকী পরিভ্রমণ করতে করতে একটি গ্রামের নিকটবর্তী হলেন।নদী সৈকতে কয়েকটি আটবিক জাতীয়া যুবতী গান গাইতে গাইতে নৃত্য পরিবেশন করছিল।এদের মধ্যে একজন যুবতী তাঁকে দেখে হেসে উঠল, ভয় পেল না।তারপর যুবতীটি নিজের গলার মালা খুলে রাজকুমারকে পরিয়ে দিল। প্রসঙ্গত স্মরণযোগ্য যে – শরদিন্দু’র ইতিহাসাশ্রিত কাহিনীতে নারী চরিত্রগুলির একটি অদ্বিতীয় বৈশিষ্ট্য হল যে তাঁরাই কাঙ্ক্ষিত পুরুষকে প্রেম নিবেদন করেন বা প্রণয়াসক্ত হন। “কালের মন্দিরা” উপন্যাসে রট্টা চিত্রককে , “গৌড়মল্লার”-তে কুহু বজ্র’কে , “কুমার সম্ভবের কবি”-তে হৈমশ্রী কালিদাস’কে , “তুঙ্গভদ্রার তীরে”-তে বিদ্যুন্মালা অর্জুনবর্মা’কে। বস্তুত নারী চরিত্রগুলিকে অনেক প্রাণবন্ত, স্বাধীন , উদার ও বলিষ্ঠভাবে তিনি অঙ্কন করেছেন। বাংলা সংস্কৃতিতে তথাকথিত নারীবাদী চিন্তাধারার আগমনের বহু আগেই শরদিন্দু সার্থকভাবে এই কাজটি করে দেখিয়েছেন। তাঁর মূল উদ্দেশ্যই ছিল এটা দেখানো যে প্রাচীন ভারতের নারীরা পুরুষের সমকক্ষই ছিলেন।

     তূণীরবর্মা ও রেবা পরিণয় বন্ধনে আবদ্ধ হন এবং নর্মদার তীরে কুটির বেঁধে থাকেন। এই প্রথম এমন একজন নারীর সংস্পর্শে সে এল যার কোন রাজকীয় আভিজাত্য নেই , সমাজের মূল স্রোত থেকে সে বহু দূরে অবস্থান করে –
“তূণীরবর্মা এমন রমণী পূর্বে দেখেন নাই ; নাগরিকা রমণীদের অন্তরে ক্ষুধা অধিক , তৃপ্তি কম।তূণীরবর্মা রেবাকে লইয়া সুখের সলিলে নিমজ্জিত হইলেন।”

    তূণীরবর্মা তাঁর ‘মাতৃভূমি’-কে তাচ্ছিল্য করেছিল।আসলে রাজসুখে নিমজ্জিত সে তো জানেই না যে মাতৃভূমি আসলে কী ? এই প্রথম সে এল রাজকীয় পরিবৃত্তের বাইরে মাটির পৃথিবীর সংসর্গে।সে প্রত্যক্ষ করল যে এদের জীবনে বিরাট কোন বৈচিত্র্য নেই।খুব সাধারণ কিন্তু আনন্দময়।অল্প চাষাবাদ করে , নদীতে মাছ ধরে , শিকার করে, মহুয়া ও বনমধু থেকে আসব প্রস্তুত করে পান করে , নেশায় মত্ত হয়ে আদিম নেশায় মেতে ওঠে।আদিম অনিরুদ্ধ তাদের জীবন যা কোন সংস্কারের বন্ধনে পঙ্গু হয়ে যায়নি। অন্যদিকে সেও অব্যবহিত সময়ের মধ্যেও তাঁদেরই একজন হয়ে উঠল – “আটবিকদের সঙ্গে তিনি ওতপ্রোতভাবে মিশিয়া গিয়াছেন , তাহারাও রাজপুতকে আপন করিয়া লইয়াছে।তূণীরবর্মা উপলব্ধি করিয়াছেন যে, অন্তরে তিনি বন্য আটবিক মানুষ, এই জীবন ই তাঁহার প্রকৃত জীবন ; এতদিনে তিনি স্বক্ষেত্রে উপনীত হইয়াছেন।নাগরিক জীবনযাত্রার জন্য তাঁহার অন্তরে বিন্দুমাত্র পিপাসা নাই।” অর্থাৎ তাঁর মনোজগতের বিরাট পরিবর্তন হচ্ছে।সে নেমে এসেছে মাটির পৃথিবীতে , মানববৃত্তে।

৪.
    একদিন তূণীরবর্মা রেবা’কে নিয়ে শিকারে গেলেন।সারাদিন আমোদ প্রমোদেই কাটল। সূর্যাস্ত হল। অন্ধকার হবার আগেই তারা বন অতিক্রম করে যেতে চাইল। এমতাবস্থায় উত্তর দিক থেকে গম্ভীর শব্দ শুনে তূণীরবর্মা থমকে দাঁড়ালেন।এই আওয়াজ তাঁর পূর্ব পরিচিত ; এটা রণবাদ্য।রেবা স্বাভাবিকভাবেই ভয় পেল।তূণীরবর্মা অনুমান করল নিশ্চয় সৈন্যদল আসছে এবং তাঁরা অরণ্যে রাত্রি যাপন করবে। তাঁরা দু’জনে পত্রবহুল শালবৃক্ষে উঠে লুকিয়ে থাকল – ‘চল্ , ওই গাছে উঠে লুকিয়ে থাকি।’ লক্ষ্যনীয় যে – তূণীর তাঁর পরিণীতাকে ‘চল্’ বলে সম্বোধন করল।’চলো’ বলে নয়।অর্থাৎ এই সম্বোধন ভঙ্গি একদম লোকায়ত ও খোলামেলা।যেমনটা উপজাতিদের ক্ষেত্রে হয়।

    তূণীরবর্মা দেখলেন যে সৈন্যদল অরণ্যে প্রবেশ করছে। বিচিত্র তাঁদের লৌহ শিরস্ত্রাণ , মুখমন্ডল শ্মশ্রুমন্ডিত।তূণীর অস্ফুট স্বরে রেবা’কে বললেন ‘ম্লেচ্ছ সৈন্য’।লেখক গল্পের প্রথমেই জানিয়েছেন যে মহেশগড় রাজ্য আকারে বৃহৎ ছিল না কিন্তু সমৃদ্ধিশালী।কয়েক বছর আগে সুলতানি শাসক আলাউদ্দিন খিলজি যখন দেবগিরি রাজ্য লুন্ঠনের জন্য দাক্ষিণাত্যে পৌঁছান তখন এই রাজ্যের পাশ দিয়ে যান কিন্তু তখনও রাজ্যে প্রবেশ করেননি। কিন্তু অনুমান করা অমূলক নয় যে তাঁরা নিশ্চয় খোঁজ খবর পেয়েছে এই রাজ্যের।পরে যে কোন সময়ে আক্রমণ করতে পারে।ফলত ত্রাস সৃষ্টি হয় – ” যবন জাতি অতি কপট ও নিষ্ঠুর ; তাহারা বিশ্বাসঘাতক , বন্ধুত্বের ভান করিয়া সদ্ভাবপ্রতিপন্ন হত্যা করে।যবন সম্বন্ধে সর্বদা সতর্ক থাকা প্রয়োজন।”

     সেই আশঙ্কাই সত্য হতে চলেছে এবার। তাঁরা নিজেদের মধ্যে বাক্যালাপ করছে।সেই ভাষা দুর্বোধ্য।তবুও যেটুকু শ্রুতি গোচর হল তার মর্মার্থ এই যে – ” মালিক কাফুর নামক এক সেনাপতি এই ম্লেচ্ছ  বাহিনীর অধিনায়ক ; তাহারা দাক্ষিণাত্যে অভিযান করিয়াছে , কিন্তু নর্মদা নদী পার হইবার পূর্বে নর্মদার উত্তর তীরে যত হিন্দু রাজ্য আছে , সমস্ত বিধ্বস্ত করিয়া যাইবে , যাহাতে পশ্চাৎ হইতে শত্রু আক্রমণ করিতে না পারে।”
রাত গভীর হলে সৈন্য বাহিনী ঘুমিয়ে পড়ল।রাত্রি শেষে দুন্দুভি ও শিঙা বেজে উঠল। ম্লেচ্ছ সৈন্যদল ঘোড়ায় চড়ে পশ্চিম দিকে চলে গেল।তূণীরবর্মা গাছ থেকে নামল। তাঁর মুখে নিদ্রাহীন রাত্রির ক্লান্তিরেখা কিন্তু ‘আরক্ত নেত্রে চিন্তার আলোড়ন’ চলছে।সে তাঁর ঘোড়াটিকে দেখতে পেল না। অনুমান করল যে ম্লেচ্ছরা চুরি করেছে।

     এরপর কুটিরে ফিরে গিয়ে আহার করে নর্মদা নদীর তীরে এসে বসল।নর্মদার স্রোত যে দিকে বইছে সেই দিকেই তাঁর মাতৃভূমি।কী অনন্য সুন্দর দৃশ্যকল্প শরদিন্দু এখানে চিত্রিত করেছেন।আমাদের সভ্যতা ঐকান্তিকভাবেই নদীমাতৃক। মানুষের জীবনযাপনের সঙ্গী , অনেক উত্থান পতনের সাক্ষী নদী।নদীর স্রোতের যা অনুকূল অর্থাৎ স্রোত যেদিকে বয়ে চলেছে স্বাভাবিক ছন্দে সেটাই মাতৃভূমি।সেখানেই রয়েছে অস্তিত্বের শিকড় ও নাড়ির নিবিড় সংযোগ।যে তূণীরবর্মা একদিন বলেছিলেন যে – ” ‘আমার বংশ নাই , মাতৃভূমি নাই। পৃথিবীতে আমি একা’।” সেই তূণীরবর্মাই মহেশগড়ে যেতে চাইল শত্রুর আগমনের সংবাদ দিতে।সে বলল যে – ” ‘আমাকে যেতেই হবে। আমার শরীরের সমস্ত নাড়ি আমাকে টানছে , না গিয়ে উপায় নেই।’ ” মাতৃভূমির কথা স্মরণ করে তাঁর হৃদয় মন শুধু অসহ্য আবেগে উন্মথিত হয়ে উঠল তাই নয় , একরকম গর্ব বোধও ফুটে উঠল।এখানেই স্বজাত্যবোধ,স্বদেশপ্রেম ও জাতীয়তাবাদের সার্থকতা।

    রেবা যখন বললেন যে ঘোড়া নেই কীভাবে যাবে ? তখন তূণীরবর্মা বললেন যে – ‘ওই নদী আমাকে পৌঁছে দেবে।’ এবং এও বলল যদি সে বেঁচে থাকে তাহলে আবার ফিরে আসবে। অর্থাৎ ব্যক্তিস্বার্থের থেকেও অনেক বড় হয়ে উঠল সমষ্টির স্বার্থ। তাঁর মানসিক ভাবান্তর ঘটল পরিপূর্ণভাবে।

      মুসলিম সৈন্যরা সেদিন আটবিক রাজ্যে আশ্রয় নিয়েছিলেন। তাঁরাও প্রত্যক্ষ করেছিল যে নর্মদা নদী দিয়ে জনৈক ব্যক্তি ভেসে যাচ্ছেন। তাঁরা গ্রাহ্যের মধ্যে আনেননি। তাঁদের দৃষ্টিতে একজন কাফের যদি মারা যায় তাতে ক্ষতি কী ! সেদিন রাত্রি তৃতীয় প্রহরে মহেশগড় রাজপুরীর পশ্চাতে বাঁধানো ঘাটে তূণীরবর্মা উঠল।গোটা রাজপুরী তখন ঘুমাচ্ছে।বলার অপেক্ষা রাখে না যে তূণীরবর্মা জানতেন কীভাবে গোপনে প্রাসাদের অভ্যন্তরে প্রবেশ করতে হয়।সে সরাসরি যুবরাজ ইন্দ্রবর্মার মহলে গিয়ে তাঁকে শত্রু পক্ষের আগমনের আগাম সংবাদ  জানালো — ” ‘ম্লেচ্ছ শত্রু মহেশগড় আক্রমণ করতে আসছে – তোমরা প্রস্তুত হও।’ ” এরপর জলপথে দীর্ঘ পথ অতিক্রম করার কষ্ট সহ্য করতে না পেরে জ্ঞান হারিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন।সেইবার মহেশগড় পরিত্রাণ পেয়েছিল আশু বিপদের হাত থেকে তূণীরবর্মার কল্যাণে। শরদিন্দু গল্পটির যবনিকাপাত ঘটালেন শুধু এই বাক্যটি লিখে – ”সেবার মালিক কাফুরের সৈন্যদল মহেশগড় রাজ্য জয় করিতে পারে নাই।”

     তূণীরবর্মার কী হল তা পাঠক জানতে পারে না।ছোটগল্পের শেষে যে অতৃপ্তি থাকে তা সুচারুভাবেই শরদিন্দু উস্কে দিয়েছেন। কিন্তু শেষ বাক্যে ফুটে উঠেছে একরকমের তৃপ্তি ও প্রগাঢ় জাতীয়তাবাদ।একজন ব্যক্তির থেকেও বড় হয়ে ওঠে স্বজাত্যপ্রীতি।এমন আশ্চর্য সুন্দর বৈপরীত্য বাংলা সাহিত্যের ক’টি ছোটগল্পে ফুটে উঠেছে ? এই গল্পেই শৃঙ্গার রস ও বীর রস দুইই এসেছে কিন্তু সবশেষে শৃঙ্গারকে ছাপিয়ে বীররসই প্রাধান্য পেয়েছে — একথা বললেও অত্যুক্তি হয় না।

৫.
   শরদিন্দু তাঁর ” তুমি সন্ধ্যার মেঘ ” উপন্যাসের অন্তিম দুই অনুচ্ছেদে গভীর ব্যঞ্জানাঋদ্ধ কিছু কথা লিখেছিলেন।তার কিয়দাংশ উদ্ধার করছি –

”      সেদিন ভারতের নাট্যমঞ্চে যে কৌতুকনাট্যের অভিনয় হইয়াছিল , যে নটনটীরা অভিনয় করিয়াছিল , তাহারা সন্ধ্যার রাঙা মেঘের মত শূন্যে মিলাইয়া গিয়াছে।… সেদিন ধীরে ধীরে নাট্যমঞ্চের উপর মহাকালের কৃষ্ণ যবনিকা নামিয়া আসিয়াছিল , প্রদীপ নিভিয়া গিয়াছিল।
       তারপর রঙ্গমঞ্চ যুগান্তকাল ধরিয়া তিমিরাবৃত ছিল।নৃত্য গীত হাস্য কৌতুক মূক হইয়া গিয়াছিল। মানুষ চামচিকার মত অন্ধকারে বাঁচিয়া ছিল।
         এবার এই পুরাতন রঙ্গমঞ্চে জানি না কোন্ মহা নাটকের অভিনয় হইবে ! ”

      কিছুটা আশঙ্কা , বেদনাবোধ ও শ্লেষ জর্জরিত এই লাইনগুলি।কারণ তিনি যথার্থই উপলব্ধি করেছিলেন যে হিন্দুদের ইতিহাস , সংস্কৃতি ও জাতীয়তাবাদী চিন্তার বলয়টিকে কীভাবে ভেঙে ফেলার চেষ্টা চলছে।যে জাতিকে তার প্রকৃত ইতিহাস ভোলানো হয় সেই জাতিকে ভয়ঙ্কর ইতিহাসের সম্মুখীন হতে হয়।আজ এই রাজনৈতিক ক্রান্তিকালে সেই মুখ ঢাকা ইতিহাস ও সংস্কৃতিকে পুনরুদ্ধারের প্রতি যে জনসাধারণের নূন্যতম হলেও ঝোঁক তৈরি হয়েছে এটাই আশার রূপোলী রেখা।বাকি কথা তো বলবে মহাকাল।।


গ্রন্থপঞ্জী (আকর গ্রন্থ) :—
১. শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায় , ঐতিহাসিক কাহিনী সমগ্র , ‘রেবা রোধসি’ (গল্প) , ‘তুমি সন্ধ্যার মেঘ’ (উপন্যাস) , আনন্দ পাবলিশার্স , একাদশ সংস্করণ ডিসেম্বর ২০১২ , পৃষ্ঠা – ২৬৯ – ২৭৪ , ৬৩৩।।

 

লেখক পরিচিতি: সুমন ব্যানার্জি
প্রতিষ্ঠান – রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয় স্নাতকোত্তর বাংলা প্রাক্তনী।
ডিপ্লোমা কোর্স ফরাসি ভাষা ও সাহিত্য (pursuing) অতুল্য ঘোষ ইন্সটিটিউট অফ্ ল্যাঙ্গুয়েজস্।

Leave a Reply