Posted on Leave a comment

প্রাচিন ভারতীয় সভ্যতা আধুনিক নদীমাতৃক সভ্যতা থেকে মহাকাব্যিক যুগ

প্রাচিন ভারতীয় সভ্যতা -- জয়দীপ গোস্বামী

ইতিহাস লিখন পদ্ধতি : 
ইতিহাস লিখন পদ্ধতির প্রথম আত্মপ্রকাশ ঘটান গ্রীক ঐতিহাসিক হেরোডোটাস। উনি প্রথম ইতিহাস রচনা করেন তাঁর Historiographer গ্রন্থে। এই ধারা কে অনুসরণ করেন আরেক গ্রীক ঐতিহাসিক থুকিডিডিস। উনি আরও সুসংহত পরিমার্জিত বিজ্ঞানলব্ধ যুক্তিপূর্ণ অনুসন্ধানের মাধ্যমে ইতিহাস রচনা করেন তাই থুকিডিডিস কে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে ইতিহাস রচনার জনক বলা হয়। ইতিহাস রচনার একটি নিদৃষ্ট রচনা প্রনালী বা লিখন পদ্ধতি আছে। যা অনুসরণ করে বর্তমান সময়ে ইতিহাস রচনা করা হয়। ইতিহাস রচনার লিখন পদ্ধতি হলো নিম্নরূপ — 
 উৎসের অনুসন্ধান : ইতিহাস লেখার প্রথম পদক্ষেপ হলো ঘটনাটির উৎসের অনুসন্ধান করা। উৎস ছাড়া ইতিহাস রচিত হয়না। কোনো প্রত্নতাত্ত্বিক, কাব্যিক, কোনো জনশ্রুতি ওই ঘটনার প্রধান উৎস হতে পারে। 
 উৎস থেকে তথ্য সংগ্রহ : ঘটনার উৎসের অনুসন্ধানের পর ঐতিহাসিক তার প্রয়োজনীয় তথ্য নথিভুক্ত করেন। এবং ঘটনাটি সম্পর্কে সঠিক ধারণা লাভ করার চেষ্টা করেন। 
 তথ্যের যাচাইকরণ : প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করার পর ঐতিহাসিক সমালোচনামূলক দৃষ্টিভঙ্গিতে সেগুলির সত্যতা যাচাই করেন। তথ্যের সত্যতা বিচার করার জন্য ঐতিহাসিক দুটি পন্থার অবলম্বন করেন – 
১) বাহ্যিক সমালোচনার দ্বারা তথ্যের জালিয়াতি বা প্রকৃত রূপ ও মৌলিকত্ব যাচাই করা। 
২) অভ্যন্তরীণ সমালোচনার দ্বারা গৃহীত তথ্যের অন্তর্নিহিত ভাবাদর্শ ও প্রেরনা সম্পর্কে নিশ্চিত করা।    
• তথ্য সংরক্ষণ : ইতিহাস বিদ ঘটনার প্রয়োজনীয় তথ্য গুলির ভিত্তিতে ইতিহাস রচনা করেন। এক্ষেত্রে তিনি তার প্রয়োজনীয় নথি গুলি নোটবুকে লিখে রাখেন। 
• তথ্যের বিশ্লেষণ : ইতিহাসবিদ গৃহীত ঘটনার গুলির নির্দিষ্ট ভঙ্গিতে বিশ্লেষণ করেন। এক্ষেত্রে ইতিহাসবিদ যদি নিরপেক্ষতা বজায় রেখে ইতিহাস রচনা করেন তাহলে পাঠকগণের এক নিরপেক্ষ ভাবধারার ইতিহাস পড়ে জ্ঞান লাভ করতে সুবিধা হয়। প্রাচিন কালে রচিত গ্রন্থ গুলির মধ্যে এই নিরপেক্ষতার অভাব লক্ষ্য করা যেত, যার ভিত্তিতে ইতিহাস রচনা অনেক কষ্টকর। 
• ঘটনা ও বক্তব্যের মধ্যে সম্পর্ক স্থাপন : ঐতিহাসিক রা দুটি ঘটনার মধ্যে সম্পর্ক স্থাপন করার চেষ্টা করেন। এই ঘটনাটির সত্য নির্ধারণ করার একটি পক্রিয়া যা মুলত চারটি নিতীর ওপর আধারিত – ক) করেসপন্ডেস থিয়োরি, খ) কোহেরেন্স থিয়োরি, গ) অথরিটি, ঘ) মেমোরি। এই ৪ ধরনের সত্যের আলোকে ঐতিহাসিক তার রচনা এগিয়ে নিয়ে যান। 
• ধারাবাহিকতা : ঘটনা গুলিকে ধারাবাহিক ভাবে পরপর সাজিয়ে ইতিহাস রচনা করার পক্রিয়া । এখানে ঘটনা গুলির ধারাবাহিকতা বুঝে ইতিহাস রচনা করা হয়। এর ফলে একটি সঠিক ঘটনা প্রনালী পাওয়া যায়। এই প্রক্রিয়াতে ঘটনা গুলিকে তিনটি পর্যায়ে রাখা হয় – ১) ঘটনার প্রাথমিক অবস্থা বা সূচনাপর্ব, ২) মধ্যামাবস্থা, ৩) ঘটনার অন্তিম পরিণতি। 
• ভৌগলিক অবস্থান : ইতিহাস রচনার ক্ষেত্রে ভৌগলিক অবস্থান নির্ধারণ করা আবশ্যিক। ঐতিহাসিক যদি ঘটনার সঠিক ভৌগলিক অবস্থান বর্ণনা করেন তাহলে পাঠকগণের সঠিক ঘটনা সম্পর্কে ধারণা লাভ করে। 
• কার্যকারণ পদ্ধতি নির্নয় : ইতিহাসবিদ ই এইচ কারের মতে ❝ The study of history is a study of causes ❞ । এক্ষেত্রে শুধুমাত্র দৃশ্যমান বা সহজে বোঝা যায় এমন কারণ অনুসন্ধান নয়, ঘটনার গভীরে লুকিয়ে থাকা কারণ খুজে বার করার জন্য কার্যকারণ সম্পর্কের ভিত্তিতে বিশ্লেষণ করে সিদ্ধান্তে উপণিত হওয়া যায়। 
    ইতিহাস রচনা প্রনালী সংক্ষেপে বর্ণিত হলো। যদি নতুন ভাবে ইতিহাস রচনা করতে হয় তাহলে তাহলে ওই রচনা প্রনালী ছাড়াও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় গুলির ওপর নজর দিতে হয় যেমন – ওই ঘটনাটির কোনো update পাওয়া যায় কিনা, কোন নতুন মতামত উপস্থাপিত হয়েছে কিনা, প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষনার ফলে কোনো নতুন তথ্য আবিষ্কার এক্ষেত্রে কার্যকর। ঐতিহাসিক স্থান গুলিতে পরবর্তী সময়ে খনন কার্য হয়ে থাকলে কোনো নতুন তথ্য পাওয়া গেলে তা ইতিহাস রচনার ক্ষেত্রে বড়ো ভূমিকা গ্রহন করে। যার ওপর ভিত্তি করে রচিত ইতিহাস গতানুগতিকতা কে ভঙ্গ করতে সক্ষম। 
     পৃথিবী প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত হচ্ছে! অতীতে যেখানে কোনো ভূভাগ অবস্থান করলে কোনো না কোনো বিপর্যয় বা প্রাকৃতিক পক্রিয়াতে তা নিশ্চিহ্ন হয়েছে। আবার কোথাও কোনো সাগর ছিলো কোনো একসময় এক বড়ো ভূমিকম্পের ফলে সাগরের তলদেশ সঙ্কুচিত হয়ে পর্বতের আকার ধারন করেছে। ভূতত্ত্বের ভাষায় বলতে গেলে বলতে হয় যে প্রাচীন কালে আমাদের এই পৃথিবীর সমস্ত ভূভাগের অবস্থা আজকের মতো ছিলো মহাদেশ গুলি একত্রে প্যানজিয়া অবস্থায় ছিলো আর সমস্ত জলরাশি নিয়ে গঠিত ছিলো প্যান্থালাসা। সমগ্র পৃথিবীতে মোট ৬ টি বড়ো পাত আর প্রায়া ৩৫ টি মাঝারি পাত আছে এই পাত গুলির সংঘর্ষের ফলে ভূভাগের কোথাও ফাটল আবার কোথাও পাহাড় পর্বতের সৃষ্টি হয়েছে । পরবর্তী কালে যুগের পর যুগ ধরে এই প্যাঞ্জিয়া গুলো ভাঙতে ভাঙতে বিচ্ছিন্ন হতে শুরু করে। এই পক্রিয়ায় ফলে আজকের পৃথিবীর উৎপত্তি ঘটে। এই পক্রিয়াকে Plate Tectonic Theory বা পাত সঞ্চরণ তত্ত্ব বলে। আমদের এই ভারত স্বাধীন ভাবে অবস্থান করতো পরবর্তী কালে এটি এশিয়া মহাদেশের সাথে যুক্ত হয়েছে। এই পাতসঞ্চরণ তত্ত্বের প্রভাবে ভারতের অভ্যন্তরেও অনেক পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়। ভারতীয় পাত আর ইউরেশীয় পাতের সংঘর্ষের ফলে টেথিস সাগর সঙ্কুচিত হয়ে হিমালয় পর্বতের উৎপত্তি ঘটেছে। এই পর্যায় বহূ বছর সময় লাগে এটা কোনো একদিনে ম্যজিকের মতো ঘটেনা। ভারতের অনেক ভূভাগ যা আগে ভারতের অংশ হিসেবে ছিলো তা বর্তমানে সমুদ্রগর্ভে। বিশ্বউষ্ণায়নের ফলে সমুদ্রের জলস্তর অনেক বেড়ে গেছে, অনেক বনসম্পদ আজ অস্তগামী, আগেকার ভারত আর বর্তমান ভারতদের অনেক পরিবর্তন ঘটেছে। 
    পুরাণ, বৈদিক সাহিত্য, মহাকাব্য, সঙ্গম সাহিত্য, লিপি ইত্যাদি থেকে আমরা প্রাচীন কালের ঘটনা প্রনালী সম্পর্কে জানতে পারা যায়। ওই সব উপাদানের দ্বারা পরবর্তী কালে ইতিহাস রচনা করে থাকেন। 
  প্রাচীন কাল থেকেই ভারতের মাটিতে অনেক সভ্যতা গড়ে উঠেছে। প্রাচীন কালে নদীমাতৃক সভ্যতা গড়ে উঠত। যার অস্তিত্ব স্থায়িত্ব নিদর্শন আবিষ্কৃত হয়েছে ভারতের নানা প্রান্ত থেকে। এই রকম একটি সভ্যতা গড়ে উঠেছিল সিন্ধু ও তা ৭টি উপনদীকে কেন্দ্র করে আজ থেকে প্রায় ৫০০০ বছর আগে গড়ে ওঠা সিন্ধু সভ্যতা। এই সভ্যতার প্রধান কেন্দ্র গুলি হলো হরপ্পা, মহেঞ্জোদারো, লোথাল, কালীবঙ্গান প্রভৃতি। ১৯২০-২১ সালে রাখালদাস বন্দোপাধ্যায় ও দয়ারাম সাহানি হরপ্পা ও মহেঞ্জোদারো অঞ্চলে খনন কার্য চালিয়ে এই সভ্যতা আবিষ্কার করেন। হরপ্পা থেকে এই সিন্ধু সভ্যতার বহূ নিদর্শন পাওয়া গেছে বলে এই সভ্যতা হরপ্পা সভ্যতা নামে বিশেষ পরিচিত। এটি ছিল একটি নদীমাতৃক শহর কেন্দ্রিক সভ্যতা। পোড়ামাটির ইঁট দিয়ে বাড়িঘর নির্মান করস হতো। সুপরিকল্পিত নগর পরিকল্পনা, উন্নত রাস্তাঘাট, স্নানাগার, শষ্যাগার, সুগঠিত নিকাষি ব্যাবস্থার প্রমান পাওয়া গেছে। এই সভ্যতা প্রায় ১৫০০ বছর স্থায়িত্ব হয়েছিলো। হরপ্পা সভ্যতার ধ্বংসের কারণ সম্পর্কে সঠিক ধারণা লাভ করা যায়। কোন Theory বেশি কার্যকর তা নিয়ে ঐতিহাসিক দের মধ্যে বিবাদের অন্ত নেই। কারোর মতে সিন্ধু নদীর গতিপ্রকৃতি পরিবর্তন, ক্রমবর্ধমান নগরায়ণের ফলে বনজঙ্গলের হ্রাস, প্লাবন ইত্যাদি কারনে এই সভ্যতার ধ্বংস হয়েছিল বলে মনে করা হয়। হরপ্পা সভ্যতার পতনের কারণ হিসেবে আরেকটি মতকে গুরুত্ব দেওয়া হয়, সেটি হলো আর্য জাতির আক্রমণ। মনে করা হয় ১৪০০ খ্রীষ্টপূর্বাব্দে আর্যজাতির আক্রমনের ফলে হরপ্পা সভ্যতার বিনাশ ঘটেছে। 
     প্রত্নতাত্ত্বিক দের মতে হরপ্পাতে ৭টি স্তর এবং মহেঞ্জোদারো তে ৯টি স্তর পাওয়া গেছে অর্থাৎ সভ্যতার ধ্বংসের পর পুনরায় সভ্যতার Reconstruction করা হয়েছিলো যার মটে ৩টি স্তরে খনন কার্য করা সম্ভব হয়েছে। বাকি স্তর গুলিতে Excavation হলে আরও অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সামনে আসবে। আচ্ছা সভ্যতার সাথে সাথে কী সভ্যতার অধীবাসীরাও নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছিল? তারা পুনরায় কোনো সভ্যতার সৃষ্টি করেনি? বাকি অংশের খনন কার্য হলে এই সব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া সম্ভব হবে। 
  এরপর আসা যাক আর্যদের নিয়ে। আর্য কারা, কোথাকার বাসিন্দা? আর্য রাই কী হরপ্পা সভ্যতার ধ্বংসের একটি কারণ? এই প্রশ্নের উত্তরের সন্ধান করতে গেলে আর্যদের সম্পর্কে কিছু ধারণা লাভ করা যাক – সাধারণত যারা হরপ্পা সভ্যতার ধ্বংস সাধন করে নতুন বৈদিক সভ্যতার সূচনা করেছিল তাদেরকেই আর্য বলা হয়। আর্য সাধারণত কোনোএকটি জাতি নয়, আর্য শব্দের প্রকৃত অর্থ হলো উচ্চ বংশোদ্ভূত সন্তান যারা সংস্কৃত, ল্যাটিন, তুখারিয়, গ্রিক, বাল্টোস্ল্যাভিক, জার্মান প্রভৃতি ভাষায় যারা কথা বলতো তারাই আর্য। এই আর্যদের বাসস্থান সম্পর্কে ঐতিহাসিক দের মধ্যে বিবাদ দেখা যায়। এই সমস্যা কে আর্য সমস্যা বলে –
I. ঐতিহাসিক দের মতে আর্যদের আদি বাসস্থান সপ্তসিন্ধু অঞ্চলে ছিলো কারণ বৈদিক সাহিত্যে আমরা সপ্তসিন্ধু অঞ্চলের উল্লেখ পাই। ভারতের বাইরে আর্যরা অনুরূপ কোনো সাহিত্যগ্রন্থ রচনা করেননি। 
II. মানুষ যদি একবার নিজের জন্মভূমিকে ত্যাগ করে অন্য কোথাও বসবাস শুরু করে তাহলে তাদের হৃদয়ে নিজের জন্মভূমির প্রতি টানের সৃষ্টি হয়। উদাহরণ স্বরূপ বলা যায় পারশিরা তাদের বাসভূমি ইরাক ছেড়ে ভারতে এসেছিল কিন্তু পারশিরা তাদের বাসভূমির কথা সগৌরবে মনে রেখেছে। কিন্তু আর্যদের ক্ষেত্রে তা দেখা যায় না। আর্যরা যে আবার তাদের আদিবাসস্থানে ফিরে গেছিলো বলে তো মনে হয়না। 
III. বেদে আমরা লবণ আর চালের উল্লেখ পাইনা, এর থেকে কখনোই এই ধারণাতে উপণিত হওয়া যায় না যে ভারতের অধিবাসী নন। আর্যরা যদি লবণের ব্যবহার জানতো না তাহলে কী তারা বিস্বাদ খাবার ভক্ষন করতো? নাকি লবণের বিকল্প রূপে কিছু ব্যাবহার করতো নাকি তা বিশেষ কিছু জানা যায় না। 
IV. আর্যদের জীবনের প্রধান অঙ্গ ছিলো যাগ যজ্ঞ। এর দরুন তারা সোমরস পান করতো। যে লতা থেকে সোমরস তৈরি হতো তা পাওয়া যেত হিমালয়ের মূজবান বা মূঞ্জবান পাহাড়ে। 
V. যারা বলেন ঋক বেদে বাঘের উল্লেখ নেই ,চালের উল্লেখ নেই, অতএব আর্যরা তখন সবেমাত্র ভারতে এসেছেন, তাঁদের কথা সত্য নয়। পাঞ্জাবের লোকেরা যে বাঘের কথা জানতেন সিন্ধু উপতক্যায় পাওয়া সিলমোহরগুলিই তার প্রকৃষ্ট প্রমাণ। কারণ ওই সিলমোহর গুলিতে বাঘের অবয়ব লক্ষ্য করা যায়। 
       আর্যরা যে ভারতের বাসিন্দা এ বিষয়ই বেশির ভাগ পন্ডিতই স্বীকার করেন না। তাঁদের এই স্বীকার না করার কারণগুলিও কিন্তু উপেক্ষণীয় নয়। 
• আর্যরা যদি ভারতের বাসিন্দা হতো তাহলে তারা ভারতের মধ্যেই তাদের সংস্কৃতির প্রসার ঘটাতে পারতো, কিন্তু তারা তা করেনি। তা না করেই তা এই ভূখণ্ড ত্যাগ করে চলে গেছিল, এটা সত্য। 
• আর্যদের সাহিত্যে আমরা আর্যাবর্তের উল্লেখ পাই। হিমালয় পার্বত্য অঞ্চল থেকে বিন্ধ্য পর্বতের পাদদেশ পর্যন্ত আর্য তাদের সভ্যতা গড়ে তুলেছিল, অন্তত এই কথাই আমরা সাহিত্য গুলিতে জানতে পারি। 
• তারা যদি সত্যি ভারতের বাসিন্দা হত তাহলে কী তারা দুঃসাহসিক অভিজানে যাওয়ার পূর্বে তাদের অস্তিত্ব ভারতের অন্যান্য যায়গাতে প্রসার ঘটাতো। 
• বৈদিক সাহিত্য গুলোতে আমরা দাক্ষিণাত্য সম্পর্কে বিশেষ কিছু জানা যায়না। দক্ষিন পশ্চিম ভারতে দ্রাবিড়ভাষী ব্রাহূই উপজাতির কথা জানতে পারা যায় কিন্তু বেদে এর কোনো উল্লেখ পাওয়া যায় না। 
       আর্যদের আদিবাসস্থান সম্পর্কে ঐতিহাসিক ব্র‍্যান্ডেন্সটাইনের মতে মান্যতা দেওয়া হয়েছে। তাঁর মতে আর্যদের আদি বাসস্থান উরাল পর্বতের পাদদেশে কিরঘিচ স্তেপ তৃণভূমি অঞ্চলে। আর্যরা স্বভাবত পশুপালন করতো। ওই তৃণভূমিতে পর্যাপ্ত খাবার ছিলো না বলে তারা আফগানিস্তান হয়ে ভারতে প্রবেশ করে। এই মত টা কতোটা যুক্তিপূর্ণ তা নিয়ে সন্দেহ আছে। 
     তবে বর্তমানে একটি তথ্য নিজের অস্তিত্ব জাহির করছে। সেটি হলো The Great Flood Theory। যদি পুরাণ এবং বৈদিক সাহিত্য গুলো থেকে প্রাচীন ভারত সম্পর্কে নানান ধারণা লাভ করা যায় তাহলে এক্ষেত্রেও তার ব্যাতিক্রম হওয়া উচিত নয়। আমাদের সনাতন ধর্মে মোট ১৮টি পুরাণ এর উল্লেখ পাওয়া যায়। এই ১৮টি পুরাণ এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো বিষ্ণু পুরাণ। বিষ্ণু পুরাণে আমরা এই মহাপ্রলয়ের বর্ননা পাওয়া যায়। বিষ্ণু পুরাণ অনুসারে গঙ্গা, যমুনা তথা বিশাল নদী গুলোর দ্বারা সমগ্র আর্যাবর্ত প্লাবিত হয়েছিল, যার ফলে সমগ্র আর্যাবর্ত জলে নিমজ্জিত হয়েছিল। এই ঘটনা র সময়সীমা অনুমান করা হয় দ্বাপর যুগের শেষের দিকে। এই ঘটনার একটা সরল ব্যাখ্যা দেওয়া যাক, যদি বর্তমানে কোথাও কোন বিপর্যয় নেমে আসে, সেই বিপর্যয়ের জেরে পুরো অঞ্চলটি নিশ্চিহ্ন, বহূ ক্ষয়ক্ষতি প্রাণহানি ঘটে, অনেক মানুষ বেঘর হয়ে পড়ে। তবে যারা এই ভয়াবহ বিপর্যয়ে নিজের প্রাণ বায়ু কে টিকিয়ে রাখতে পারে তারা অন্ন বস্ত্র বাসস্থানের আশায় অন্যত্র স্থানান্তরিত হয়ে বসবাস শুরু করে এবং বেশ কয়েক বছর পর তারা বা তাদের উত্তরসূরী রা তাদের পুরোনো নিজ বাসভূমিতে ফিরে এসে আবার বসবাস শুরু করলো। কিন্তু যেই সময় তারা নিজ বাসভূমি ত্যগ করে অন্যত্র বাস করতে থাকে সেই সময়ে অন্য কোনো মানুষ সেখানে বসবাস শুরু করেছে। যারা নিজের বাসভূমি তে ফিরে এসেছিল তারা এখনকারের বাসিন্দা দের উৎখাত করলো বা তাদের সাথেই একসাথে বসবাস করা শুরু করলো। এই ঘটনা নিছক কল্পনা নয় বাস্তবেও ঘটে থাকতে পারে। তাহলে অনুমিত হয়ে যে প্রায় ১৪০০ খ্রীষ্টপূর্বাব্দে আর্যরা ভারতে প্রবেশ করে এবং নদীমাতৃক নগরকেন্দ্রিক সভ্যতার পতন ঘটিয়ে নতুন গ্রাম কেন্দ্রিক বৈদিক সভ্যতার সূচনা করে। তবে আর্যদের বাসস্থান সম্পর্কে কোনো নির্দিষ্ট প্রত্নতাত্বিক প্রমান পাওয়া যায় নি তাই কোনো মতকেই অগ্রাহ্য করা যায়না । পরবর্তী সময়ে যদি কোনো সঠিক প্রমাণ পাওয়া যায় তাহলে ঐতিহাসিকরা তার ভিত্তিতে ইতিহাস রচনা করবেন। 
 আর্য সভ্যতার সংক্ষিপ্ত বিবরণ হিসেবে বলা যায় যে আর্য সভ্যতা ছিলো একটি গ্রাম কেন্দ্রিক সভ্যতা। এই সভ্যতায় সম্পদের প্রধান মাপকাঠি ছিলো গরু, যার ঘরে যত গরু তাকে ততো বেশি ধনী বলা হতো। বৈদিক সভ্যতা থেকেই ছোট ছোট রাজ্যের উদ্ভব ঘটতে শুরু করে, যা জনপদ নামে পরিচিত। সমগ্র আর্যাবর্ত জুড়ে প্রায় ৪০টি জনপদ গড়ে উঠেছিল। যাদের মধ্যে মোটে ১৬ টি জনপদ তার পার্শ্ববর্তী জনপদ গুলিকে নিজের আয়ত্বে এনে এক বিশাল সাম্রাজ্য গঠন করেছিল। এই ১৬ মহাজনপদ হলো কাশি, কোশল, অঙ্গ, মগধ, বৃজি বা বজ্জি, মল্ল, চেদি, অস্মক, অবন্তী, কুরু, পাঞ্চাল, শৌরসেন, বৎস, মৎস, কম্বোজ, গান্ধার। খ্রীস্টপূর্ব ১৪দশ শতক থেকে ৬০০ শতক সময় কাল কে বৈদিক যুগ হিসেবে মনে করা হয়। ধরা হয় এই সময়েই রচিত হয় বেদ গুলো। ৬০০ শতকের পর ১৬ মহাজনপদের মধ্যে মগধ শক্তিশালী হয়ে ওঠে। 
        সবার থেকে বিস্ময়কর ব্যাপার হলো যদি ১৪০০ খ্রীষ্টপূর্বাব্দে ১৬ মহাজনপদ গুলি গড়ে উঠেছিল তাহলে মহাভারতে এই জনপদ এবং মহাজনপদ গুলির উল্লেখ পাওয়া যায়। যদিও আধুনিক ঐতিহাসিক দের মতে মহাভারতের রচনা কাল হলো প্রায় ১০০০ খ্রীস্টপূর্ব থেকে ১০০ খ্রীস্টাব্দের মধ্যে। মহাভারতে আমরা অনেক ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জনপদের উল্লেখ পাওয়া যায়, তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো কাশি, কুরু, পাঞ্চাল, অঙ্গ, বঙ্গ, কলিঙ্গ, মৎস, বৃজি, মথুরা, বৃন্দাবন, চম্পক পৃভতি। মহাভারতে মগধ, কুরু, পাঞ্চাল, অঙ্গ, মৎস, গর্গ, কারুশ, পুন্ড্র, দাক্ষিণাত্য, পারবরটক, দর্শেক, কাশ্মীর, উরশ, পিশাচ, মুদগলা, কম্বোজ, বতধন, চোল, পান্ড্য, ত্রিগর্ত, মালব, দরদ জনপদ গুলির বর্ণনা পাওয়া যায়। মগধে রাজা জরাসন্ধের প্রভাব, মথুরা তে কংসের অত্যাচারের কথা জানতে পারা যায়। ভগবান বিষ্ণুর অবতার কৃষ্ণ এবং ওনার দ্বারা নির্মিত দ্বারকা নগরী। কিন্তু তার সঙ্গে পরবর্তী বৈদিক যুগের রাজা রাজড়াদের সঙ্গে মিল পাওয়া যায় না। ৬০০ খ্রীষ্টপূর্বাব্দে মগধে হর্ষঙ্ক বংশীয় রাজারা রাজত্ব করতো তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো বিম্বিসার। কিন্তু এই পর্যায়ে জরাসন্ধ নামক কোনো রাজার উল্লেখ পাওয়া যায় না। মহাভারতের যুদ্ধের কথা আমরা অল্পবিস্তর জানি, ওই যুদ্ধ কে পৃথিবীর সবথেকে বৃহত্তম যুদ্ধ হিসেবে বিবেচিত হয়। এই যুদ্ধে অনেক পৌরাণিক অস্ত্র শস্ত্রের ব্যাবহার করা হয়েছিল যেমন, পাশুপতাস্ত্র, বৈষ্ণবাস্ত্র, ব্রহ্মাস্ত্র, অঞ্জলি অস্ত্র প্রভৃতি। বর্তমান সময়ের নিউক্লিয়ার মারণাস্ত্রের মতো সমান ক্ষমতাযুক্ত এবং সমান বিদ্ধংসী। কিন্তু পরবর্তী কালে এই সব অস্ত্র শস্ত্রের ব্যাবহার করা হয়নি। যদি মহাভারত পরবর্তী বৈদিক যুগে সংগঠিত হতো তাহলে এই সকল অস্ত্র শস্ত্রের ব্যাবহার প্রচলন থাকার কথা। এই প্রবন্ধের শুরু তেই ভারতের ভূভাগ নিয়ে বর্ণনা করা হয়েছে। এই মহাভারত পর্বেও একটা ভূভাগের প্রমান পাওয়া যে সেটা সেইসময়ে ভারতের অংশ হিসেবে থাকলেও পরবর্তী কালে তা আরব সাগরে ডুবে যায়। হ্যাঁ ভগবান শ্রী কৃষ্ণের দ্বারা নির্মিত নগরী দ্বারকা। যা তিনি জরাসন্ধের আক্রমণের হাত থেকে তাঁর প্রজা দের রক্ষা করার জন্য পশ্চিমে সৌরাষ্ট্র অঞ্চলে দ্বারকা নগরীর স্থাপনা করেন। Archeological survey of India র গবেষণার ফলে দ্বারকা সম্পর্কে বহু তথ্য আবিষ্কার করা হয়েছে। আরব সাগরের তলায় একটা প্রাচীরের অবশেষ পাওয়া গেছে যা কোনো মতেই প্রাকৃতিক নয়, দ্বারকা তে বাসিন্দাদের পরিচয়ের জন্য ঝিনুক সিল দ্বারা নির্মিত Identity Card ব্যাবহারের প্রচলন ছিলো বলে মনে করা হয়। বেট দ্বারকা তে খনন কার্যের ফলে এইরূপ সিলের হদিশ মিলেছে। এই সব প্রত্নতাত্ত্বিক উপাদানের গড় আয়ু ৭৫০০ খ্রীষ্টপূর্বাব্দ কে নির্দেশ করছে। কিন্তু ভারতীয় জ্যোতির্বিজ্ঞানী আর্যভট্টের মতে মহাভারতের যুদ্ধ সংগঠিত হয়েছিল ৩১০০ খ্রীষ্টপূর্বাব্দে। যার পর মহাপ্রলয় এবং তার পরে হরপ্পা সভ্যতার সূচনা। 
       মহাভারত প্রধানত রচিত হয়েছিল সংস্কৃত ভাষায়। মহাভারতের রচনা করেন কৃষ্ণ দ্বৈপায়ণ বেদ ব্যাস। আর এই সমগ্র মহাভারত লিখেছিলেন স্বয়ং ভগবান গনেশ। কিন্তু হরপ্পা সভ্যতায় আমরা কিউনিফর্ম লিপির ব্যাবহার লক্ষ্য করি যা এখনও পাঠোদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। তাহলে কী হরপ্পাবাসীরা সংস্কৃতের ব্যাবহার জানতেন না। নাকি সত্যি হরপ্পা সভ্যতার পরে মহাভারত রচিত হয়েছিল। 
     মহাভারত পর্বে আমরা অনেক মন্দিরের উল্লেখ পাই যার অস্তিত্ব এখনও বর্তমান। যেমন সোমনাথ মন্দির, কেদারনাথ মন্দির, বিশ্বনাথ মন্দির, মল্লীকার্জুন মন্দির, ভীমা মন্দির প্রভৃতি যার অস্তিত্ব আজও বর্তমান তাহলে ওই মন্দির গুলি কতো প্রাচীন। আগেকার দিনের মুণী ঋষিরা Non linear time perceive করতে পারতেন, যার মাধ্যমে ওনারা একসঙ্গে ভূত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ দেখতে পেতেন। হয়তো এমনই একজন ত্রিকালজ্ঞ ব্যাক্তি ছিলেন ব্যাসদেব উনিও Non Linear Time Perceive করতে পারতেন যার মাধ্যমে উনি ভবিষ্যতের মন্দির গুলি দেখে রচনা করেছিলেন। নাহলে এই মন্দির গুলির আনুমানিক বয়স ৮০০০ বছরের বেশি তা কি আদেও সম্ভব। 
    এরপর আসা যাক রামায়ণের যুগে, অর্থ্যাৎ ত্রেতা যুগে। সনাতন ধর্ম অনুযায়ী সময়কে চারটি যুগে ভাগ করা হয়েছে, সত্য, ত্রেতা, দ্বাপর এবং কলি। রামায়ণ রচিত হয়েছিল ত্রেতা যুগে কিন্তু অনেক টীকাকার, ভাষাতত্ত্ববিদ, ইতিহাসবিদদের মতে মহাভারতের পরে রামায়ণ রচিত হয়েছিল বলে মনে করেন। কিন্তু তা সম্ভব নয়। কারণ মহাভারতে যে সমস্ত উপমা, সমাজ পরিকল্পনা, ভাষার ব্যবাহার করা হতো তা রামায়ণের থেকে প্রাচীন বলে মনে করা হয়। আজথেকে প্রায় ৭০০০ বছর আগে এই ভারতের রঙ্গমঞ্চে অভিনিত হয়েছিলো সত্যিকারের রামায়ণ। যেখানে স্বয়ং রাম এই ধরাধামে অবতির্ণ হয়েছিলেন। আধুনিক গবেষকের মতে ১৫০০ খ্রীস্টপূর্বাব্দে রামায়ণ রচিত হয়েছিল। কিন্তু বর্তমানে যে সমস্ত নির্দশন আবিষ্কৃত হয়েছে সেগুলো রাময়ণের সময়কাল প্রায় ৭৫০০ বছর পুরোনো কে নির্দেশ করছে। 
 রামায়ণের সঙ্গে যোগ অঙ্গাঙ্গিক ভাবে জড়িত। রামায়ণের প্রায় ২৪০০০ শ্লোকে অযোধ্যার রাজা পুরুষোত্তম রামের উল্লেখ পাওয়া যায়, যাঁর জীবন সুখকর ছিলো না। তাঁর জীবন অতিবাহিত হয়েছে নিরলস পরিশ্রম এবং অসহনীয় পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়েছিলেন, সেগুলিকে তিনি তাঁর রাজকীয় দৃঢ়তা এবং মানসিক সংযমের মাধ্যমে জয় করেছিলেন । 
চার্লস ডারউইন তাঁর ❝ The origin of species by means of natural selectors❞ ** গ্রন্থে যোগ্যতমের উদবর্তন সম্পর্কে ধারণা দিয়েছিলেন, সমাজের সাথে সময়ের সাথে পরিবর্তনশীল প্রকৃতির বাতাবরণের সাথে খাপ খায়িয়ে নিজের অস্তিত্বকে টিকিয়ে রাখতে সক্ষম হয় তারাই পরবর্তী কালে বংশবৃদ্ধি করে নিজের প্রজন্মের বিকাশ ঘটায়, যারা এই যুদ্ধে জয়ী হতে পারেনা তারা চিরতরে নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। উনি ওনার গ্রন্থে মানব জাতির উৎপত্তি আর বিবর্তনের কথা ব্যাক্ত করেছেন। মানব জাতির উদ্ভব ঘটেছে এপ জাতীয় এক প্রকার বানর থেকে। বছরের পর বছর ধরে বিবর্তনের পক্রিয়া চলতে থাকে। মানব বিবর্তনের ধারা গুলি হলো ***
• ইজিপ্টোপিথেকাস 
• ড্রায়োপিথেকাস
• রামাপিথেকাস 
• অস্ট্রালোপিথেকাস 
• হোমো হাবিলিস 
• হোমো ইরেক্টাস 
• সিনানথ্রোপাস 
• হোমো স্যাপিয়েন্স নিয়ানডারথালেনিস 
• হোমো স্যাপিয়েন্স স্যাপিয়েন্স 
ক্রমবিবর্তনের ধারার মাধ্যমে আজকের মানব জাতির সৃষ্টি হয়েছে। তবে বর্তমান মানব গোষ্ঠী পরবর্তী সময়ে বিবর্তিত হয়ে নতুন কোনো গোষ্ঠীর সৃষ্টি হবে কী! 
    এবার আসাযাক রামায়ণের সাথে যোগ্যতমের উদবর্তন আর মানব জাতির ক্রমবিবর্তনের ধারার সম্পর্ক কোথায়। রামায়ণে আমরা বানর গোষ্টির উল্লেখ পাই যারা রামের নেতৃত্বে রাবণের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিলো। আমরা জানি মানব জাতির উৎপত্তি এক বানর প্রজাতি থেকে। তাহলে এই ধারণা তে বদ্ধমূল হওয়া যায় যে যারা ত্রেতা যুগে বানর হিসেবে ছিলো তারাই পরবর্তী কালে পরিণত মানুষ রূপে বিবর্তিত হতেই পারে। অর্থাৎ এই বিবর্তনের ধারা ত্রেতা যুগেও ছিলো। আর ত্রেতা যুগে পরিণত মানুষ আর বানর বা অপিরণত নর রা একসাথে বসবাস করতো। কিন্তু পরবর্তী যুগে অর্থাৎ দ্বাপর যুগে আমরা বানর গোষ্ঠি সম্পর্কে বিশেষ জানতে পারিনা। হয়তো ওই বানর রাই পরবর্তী কালে মানুষ এ রূপান্তরিত হয়েছিল। এই ধারণা টি সুসংগত কিনা তা পরবর্তী কালে গবেষণার ফলেই জানতে পারা যাবে। রামায়ণে আমরা যেই সকল জনপদ গুলির কথা জানতে পারি তাদের মধ্যে কয়েকটি উল্লেখযোগ্য নাম হলো অযোধ্যা, মিথিলা, কুরু, কিস্কিন্ধা, লঙ্কা, অন্ধ্র, পুন্ড্র, চোল, পান্ডা, কেরল, মেখালা, উৎকল, দশার্ন, অভ্রবন্তী, অবন্তি, বিদরভাস, ম্লেচ্ছ, পুলিন্দ, শূরসেন, প্রস্থল, ভারত, মদ্রক, কম্বোজ, দরদাস, কিরাত, তঙ্গন, যবন, শক, চিন, মহাচিন এবং নিহার **। এদের মধ্য গুরুত্বপূর্ণ হলো অযোধ্যা, মিথিলা, সুমেরু, লঙ্কা প্রমুখ। প্রাচীন কালে আমাদের হরপ্পা সভ্যতার মতো টাইগ্রিস ও ইউফ্রেটিস নদীর তীরে গড়ে উঠেছিল মেসোপোটেমিয়া সভ্যতা, যা সুমেরীয় সভ্যতা নামেও পরিচিত। ওই মেসোপোটেমিয়া সভ্যতার একটা প্রধান কেন্দ্র ছিলো সুমেরু যা বর্তমানে ইরাকে অবস্থিত। এই সুমেরুই কী প্রচীন রামায়ণে বর্ণিত হনুমানের জন্মস্থান। যদি তাই হয় তাহলে ধরে নিতে হবে ওই সময় ওই অঞ্চলে অপরিণত মানুষ রা বসবাস করতো। তারা পরবর্তী কালে মানুষে বিবর্তিত হয়েছে। তবে ভারতে ২ কোটি বছরের পুরনো যে সমস্থ অস্থির দেহাবশেষ পাওয়া গেছে বিজ্ঞানীরা তার নাম করণ করেছেন রামাপিথেকাস, সুগ্রিবপিথেকাস। অর্থ্যাৎ ওনাদের মতে ওই সময় রামায়ণ গঠেছিলো। অতএব এই ধারণা ফেলনা নয়। রামায়ণেও আমরা নানা বৈদিক অস্ত্র, তীর ধনুক দিয়ে যুদ্ধের বর্ণনা পাই, তবে মহাভারতের যুদ্ধ কৌশল রামায়ণের রণকৌশল অপেক্ষা অনেক উন্নত। মহাভারতের যুদ্ধে আমরা অনেক যুদ্ধকৌশল বা ব্যূহ রচনা করার কথা জানতে পারি। কৌরব এবং পান্ডব উভয় পক্ষদ্বারা প্রায় ১৮টি ব্যূহ রচিত হয়েছিল যথা ক্রোঞ্চ ব্যূহ, মকর ব্যূহ, সৈন্য ব্যূহ, মন্ডলাকার ব্যূহ, ত্রিশিখর ব্যূহ, কূর্ম ব্যূহ প্রভৃতি। কিন্তু রাময়ণে এইরূপ কোনো যুদ্ধকৌশলের কথা জানা যায় না। রামায়ণে আমরা রাবণের পুষ্পক রথের কথা জানতে পারি যা বর্তমান বিমান গুলির মতো আকাশে উড়তো। তাহলে কি সত্যি রামায়ণে এতো উন্নত প্রযুক্তি ছিলো! তো রামের কাছে কি এই পরিষেবা ছিলো না। রাময়ণ সসম্পর্কে বিশেষ কোন তথ্য প্রমান পাওয়া যায় না যার দ্বারা নিশ্চিত করে বলা যায় যে রামায়ণ সত্যি হয়েছিলো।রামায়ণে আমার জাহাজের বর্ণনা পাইনা, যদি ওই সময়ে জাহাজের ব্যাবহার জানত তাহলে রাম ও তার বানর সেনা সেতু নির্মাণ করার পরিবর্তে জাহাজে করে লঙ্কা যেতে পারতেন।আমরা হরপ্পা সভ্যতায় জাহাজে করে বহির্বিশ্বে বানিজ্য করার বর্ণনা পাই, লোথাল এ জাহাজ ঘাটা আবিষ্কৃত হয়েছে যা প্রমান করে হরপ্পা সভ্যতায় জাহাজের ব্যাবহার জানতো। আবার আমরা রামায়ণে অসুর দের বর্ণনা পাই ,রাম অত্যাচারী অসুর দের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিলেন। আদতে এই অসুর কারা তা নিয়েও মত পার্থক্য আছে। বৈদিক যুগে যারা আর্যদের গরু, সম্পদ লুঠ, চুরি করতো তাদের আর্যরা আসুর, রাক্ষস, পিশাচ, দৈত্য ইত্যাদি বলতো। তাহলে রামায়ণ পর্বে অসুর কারা? রামায়ণের শেষ ভাগে যে সেতু নির্মাণের বর্ণনা পাওয়া যায় তা নিয়ে অনেক প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণা ছলছে, ওই গবেষনা থেকে জানতে পারা যায় যে ওই সেতুটি চুনাপাথর দ্বারা নির্মিত যার গড় আয়ু ১০০০০ বছর। রামায়ণে বর্ণিত স্থান গুলিতে ঐতিহাসিক পর্যবেক্ষণ চালানো হলে অনেক তথ্য সামনে আসতেও পারে যা প্রমাণ করে দিতে পারে সত্যি এই ভারত বর্ষ জুড়ে রাম রাজ্য স্থাপিত হয়েছিলো। তবে এক্ষেত্রে বড়ো সমস্যা হলো তুলশী দাস রচিত রামচরিতমানস গ্রন্থে রাম কে নিয়ে বর্ণিত অনেক অতিরঞ্জিত কাহিনি। তাই প্রত্নতাত্বিক গবেষণার ফলেই সঠিক তথ্য সামনে আসবে এবং তথ্যের গ্রহনযোগ্যতা বাড়বে। 
  আচ্ছা যদি রামায়ণের শেষদিকের কাহিনি টা যদি একটু পরিবর্তিত হতো তাহলে কী তার মূল ভাবের কিছু পরিবর্তন হতো। যদি লঙ্কা টি ভারতের মূল ভূখন্ডের সাথে যুক্ত হতো তাহলে কী রামায়ণে রাম ও তার বানর সেনা কে লঙ্কা তে যাবার জন্য সেতু নির্মাণ করার প্রয়োজন হতো। কিন্তু আমরা রামায়ণে সেতু নির্মাণ এর কাহিনি দেখতে পাই তাই এটি কি সম্ভব। তবে অসম্ভব ও হতে পারে না। তবে ওই সেতুটি কী আদতে রামের নির্মাণ করা নাকি হিমালয়ের কোনো অংশ তা নিয়ে তর্জার অন্ত নেই। প্রাচীন তামিল সাহিত্য গুলিতে একটি দ্বীপের উল্লেখ আছে যা কন্যাকুমারী থেকে শুরু হয়ে পশ্চিমে আফ্রিকা, মাদাগাস্কার পর্যন্ত এবং পূর্বে অস্ট্রেলিয়া পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। এই প্রাচীন দ্বীপের নাম কুমারী নাডু বা কুমারী কন্দম। কুমারী কন্দম সম্পর্কে প্রথম চর্চা শুরু হয় ১৯ শতকে। একদল আমেরিকান আর ইউরোপিয়ান ছাত্ররা অনুসন্ধান চালিয়ে প্রথম এটির সন্ধান পায়। তার পরবর্তী সময়ে ২০ শতাব্দীতে তামিল সাহিত্যে এই লিমুরিয়া নিয়ে চর্চা শুরু হয়। এই দ্বিপের প্রমান বেদ এবং সংস্কৃত সাহিত্য গুলিতে পাওয়া যায়। তামিল সাহিত্য এবং সংস্কৃত সাহিত্য অনুসারে তামিল নাডু অঞ্চলে পাড্যন নামে এক রাজা রাজত্ব স্থাপন করে ছিলো এই সাম্রাজ্য আয়তনে অনেক বিশাল ছিলো যা বেশির ভাগটাই সমুদ্রের ওপর ভাসমান দ্বিপ। পাড্যন রাজা তার সাম্রাজ্যের একটি অংশে তার কন্যাকে শাসন ভার অর্পণ করেছিলেন। তিনি ওই অংশকে মোট ৪৯ টি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অঞ্চলে ভাগ করে দিয়েছিলেন, সেগুলি হলো 
• Elu Tenku Natu, 
• Elu maturai natu, 
• Elu munpalai natu, 
• Elu pinpallia natu, 
• Elu kurna natu, 
• Elu kunakarai natu, 
• Elu kurumpanai natu. 
এই ৪৯টি প্রদেশে রাজত্ব করতেন পাড্যন রাজার কন্যা কুমারী। তাই এই অঞ্চলটি কুমারী নাটু বা কুমারী কন্দম নামে পরিচিত। পরবর্তী কালে মহাসাগরীয় উপকূলে প্রবল সুনামির ফলে সমগ্র অঞ্চল জলের তলায় চলে যায়। এই বিবরণ আমরা তামিল সাহিত্য গুলো থেকে পাই। তবে এই ঘটনার সময়সীমা সম্পর্কে সঠিক ধারণা পাওয়া যায় না। যদি রামায়ণের সেতু নির্মাণ করার বর্ণনা আদতে ঘটে থাকে তাহলে কুমারী কন্দম এর সময়সীমা রামায়ণ পূর্ববর্তী সময়ে। এই বিষয়টি বহু ব্যাক্তদের দ্বারা সমালোচিত হয়েছে। অনেকে এই দ্বিপ এর অস্তিত্ব মানতে রাজি নন। Dr. K. K Pillai, নিল কান্ত শাস্ত্রী এই তথ্যের গলদ হিসেবে বলেছেন, যদি সত্যি কুমারী কন্দম ভারতের অংশ থাকে তাহলে সেটি মানব সভ্যতার বিকাশের বহু পূর্বে সেই সময় মানব সভ্যতার অস্তিত্ব কোথায়। এবিষয়ে কে কে পিল্লাই এর মতে ❝ The accept this is not to accept the view that the entire Lemuria or Gondvana continent existed in the age of the Tamil Sangam, as is sometimes believed. Some of the writers on the Tamil sangam might have held that the first Tamil Academy flourished in south Madurai which according to them lay to the south of the tip of South India. This view has been shout to be reinforced by the Lemurian theory. But it is important to observed that the lemurian continent must have existed, if all long long time ago. According to geologist the dismemberment of the Lemuria or Gondvana continent into several units must have taken place towards the close of the mesozoic era ❞* 
     ভারতের ইতিহাস রচনা করা সব থেকে কঠিন একটা কাজ। আর একটি ঘটনার সাথে ওপর ঘটনার মধ্যে সামঞ্জস্য রক্ষা করে যুক্তি অনুমান দিয়ে বিচার করে ইতিহাস রচনা করার চেষ্টা করা আরও কষ্টসাধ্য জিনিস। এক্ষেত্রে প্রাচীন ভারতীয় সভ্যতা গুলির মধ্যে সামঞ্জস্য রক্ষা করে অনুমান, যুক্তি সত্য, তথ্য বিচার করার চেষ্টা মাত্র। 
Reference : 
• * Pillay. K. K (1963) South India and Cyclone. University of Madras, page – 6 
• ** ভারত ও বিশ্বের ইতিহাস, একাদশ শ্রেনী – অধ্যাপক জীবন মুখোপাধ্যায়, পাতা – ৭১ 
• *** ভারত ও বিশ্বের ইতিহাস , একাদশ শ্রেনী – অধ্যাপক জীবন মুখোপাধ্যায়, পাতা – ৩০-৩২ 
• **** ভারত ও বিশ্বের ইতিহাস, একাদশ শ্রেনী – অধ্যাপক জীবন মুখোপাধ্যায়। 
Leave a Reply