অনামী - জয়দীপ গোস্বামী

ইতিহাস যেমন স্বপ্নপূরণের সাক্ষী হয়ে থাকে তেমনই আবার ব্যার্থতা আর স্বপ্ন ভঙ্গে স্মারক হয়েও থাকে। সেই রকমই একটা ব্যার্থতার কাহিনি ঘটে গিয়েছিল সেই অহিচ্ছত্র রাজবাড়ীতে। পাগলামি গুলোকে আঁকড়ে ধরে বেঁচে থাকা বৈজায়ন্তকের। ওই বিশাল রাজবাড়ীর এক নামমাত্র কর্মচারীর ছেলে হয়ে ভাবতে পারে কীকরে যে সে রাজকন্যার সাথে গাত্রবন্ধনে বাঁধা পড়বে। সময় তার এই চিন্তাভাবনা কে প্রশয় দিল কী করে। রাজপ্রাসাদের এক নিম্ন দ্বাররক্ষীর পুত্র বৈজায়ন্তক। না তার শরীরে রাজকূল মর্যাদা সম্পন্ন লাল রক্ত প্রবাহিত হচ্ছে, না আর মস্তক আলোকিত করে কোনো মণি মুক্ত খচিত রাজমুকুট শোভা দিচ্ছে না, না তার অট্টালিকার কোনো এক গুপ্ত কক্ষ পরিপূর্ণ আছে প্রচুর ধণসম্পদের দ্বারা। এই সবের কোনোটাই বৈজায়ন্তের ছিলো না। তবে কিছু একাটা ছিলো ওর মধ্যে, আর তা হলো তার রাজকন্যা প্রিয়ের প্রতি অগাদ প্রেম, আর সারাজীবন পাগলামির বন্ধনে বেঁধে রাখার অদম্য ইচ্ছে। প্রিয়েও কী তার এই বন্ধনে বাঁধা পড়েছিল! হয়তো পড়েছিলো, কারণ বৈজায়ন্তকের এই জীবনের শুরু থেকে প্রিয়ে। রাজার ছেলে না, কোনো অভিজাত বংশের রক্তও তার শরীরে নেই। নিতান্ত পক্ষে সমাজের কোন উচ্চ মর্যাদা বিশিষ্ট কোনো বংশদ্ভূত ও সে নয়। তাহলে রাজা কী কারণে তার একমাত্র কন্যাকে বৈজায়ন্তকের কাছে সমর্পণ করবে। আর নিতান্ত এক দ্বার রক্ষীর পুত্রকে প্রিয়ের মতো এক রাজকন্যা কীভাবে নিজের জীবন সঙ্গী হিসেবে নির্ণয় করতে পারে, সেটা কী শোভা বর্ষন করে। সাজানো স্বপ্নের একটা দিক অসম্পূর্ণ ছিলো। সময় কী বৈজায়ন্তক কে প্রতিষ্ঠিত হবার জন্য সময় দিতে অপারক ছিলো। বৈজায়ন্তক দ্বাররক্ষীর পুত্র হলেও অস্ত্র বিদ্যায় পারদর্শী, বীর রাজোপযুক্ত গুণের অধিকারী, সৌম্যকান্তি। যে চাইলেই যে কাওকে তার পাগলামির বন্ধনে আবদ্ধ করতে পারে। হয়তো সময় টা রাজকন্যা প্রিয়ের কাছে ছিলো না। প্রিয়ের সময় ছিলো না বৈজায়ন্তকের জীবন বারিতে ভাসমান তরীর কান্ডারী হয়ে তরী রূপ বৈজায়ন্তক কে সাফল্যের শিখরে নিয়ে যাবার জন্য। এর জন্য পর্যাপ্ত সময় বা ইচ্ছে কোনোটাই কী রাজকন্যা প্রিয়ের ছিলো না। না রাজকূল মর্যাদা সম্পন্ন রাজপরিবারের রাজকন্যার পক্ষে বৈজায়ন্তকের মতো এক দ্বাররক্ষীর পুত্রের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়া শোভা দেয়না। যথারিতি রাজপরিবারের ধারা মান্য করেই স্বয়ম্বর সভা আয়োজিত হয়। আর সেই সমম্বরে উপস্থিত হয় বিদর্ভ রাজা। রাজার পছন্দ, পরে রাজকন্যা প্রিয়ের ও পছন্দ। আর প্রিয়ের মনে এখন বৈজায়ন্তকের প্রতি তীব্র ঘৃণার বাসা তার গোটা মস্তিষ্কে ছেয়ে গিয়েছে। আজ প্রিয়ে সমস্ত বন্ধন থেকেই মুক্ত। পাগলামির বন্ধন রাজার কাছে চূর্ণ বিচূর্ণ হয়ে গিয়েছে। প্রিয়ে আর চিন্তাও করতে পারেনা তার বিহনে বৈজায়ন্তকের চিত্তের অস্থিরতা কেটেছে কীনা। না নব রাজপ্রেমে মত্ত হবার দরুন এই ভাব বার সময় টুকু নেই প্রিয়ের কাছে। এবার শুধু বিবাহের অপেক্ষা, যদিও তার সময় ও আগত। প্রিয়ে বিহনে বৈজায়ন্তকের চিত্তক্ষুন্ন দশা। মনে বিশাদের ছোঁয়া আর দেহে দূর্বলতার বিষন্নতার ছাপ। অস্ত্র বিদ্যা শিক্ষার ও কোনো ইচ্ছে নেই তার মনে। সত্যি জীবন আর সময় সব পারে। সময় প্রেম জাগাতেও পারে আবার প্রেমকে বিরহে রূপান্তরিতও করতে পারে। বৈজায়ন্তক তার প্রিয়েকে প্রেম করে এসেছে এবং আজীবন প্রেম করে যাবে। তাতে তো কারোর বাধা দেবার নেই। কারণ প্রেম জিনিসটা খুবই বিচিত্র জিনিস। কখন কার প্রতি উদয় হবে কেও জানেনা। আর বৈজায়ন্তকের মননে প্রিয়ে একমাত্র এবং অদ্বিতীয়া। সময় কী পারবে প্রিয়ের অস্তিত্ব কে মুছে দিতে। সেটা সময়ের ওপরেই থাক। সময় সব পারে। 
 
 
 
 
Author

Leave a Reply