fbpx

অনুঘটক – শ্রী প্রতীপ কুমার হাজরা

অনুঘটক - শ্রী প্রতীপ কুমার হাজরা

অরিজিত কি মনে করে মেইলের সেন্ড বাটন টা টিপে দিল| তার চাকরির ইস্তফাপত্র বলে কথা| কদিন ধরেই যা তার ড্রাফটে ঘোরাফেরা করছিল| সেন্ড সাকসেসফুলি মেসেজটা আসতেই তার চোখের কোনটা চিক চিক করে উঠলো| এক ফোটা চোখের জল নিজের অজান্তেই গালে নেমে এলো| সবার অলক্ষ্যে তা মুছে ফেলল অরিজিত|  পাশেই শুয়ে অমৃতা, এক ঝলক তার দিকে তাকিয়ে মোবাইল ফোনটা লক করে শুয়ে পড়ল সে| এপাশ-ওপাশ করতে করতে কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছে বুঝতেই পারেনি, অথচ তার বোঝাটাই সবচেয়ে বেশি দরকার ছিল| হঠাৎ করে ঘুম ভেঙে গেল অরিজিতের| না কোন স্বপ্ন নয়, কিছুক্ষণ আগেই ইস্তফা পত্র পাঠিয়েছে ম্যানেজার আর কোম্পানির হেড অফিসে| অজানা উত্তেজনায় ঘামে ভিজে যায় তার শরীর, গলা বুজে আসতে চায়| সংসারের দায়িত্ব, মায়ের শরীর, অমৃতার আবদার, সোহিনীর পড়াশোনার খরচ সে চালাবে কি করে? এক বিরাট প্রশ্নচিহ্নের মুখে দাঁড়িয়ে তার ভবিষ্যৎ| কিন্তু পরক্ষনেই তার মনে পড়ে যায় কি দুর্বিষহ মানসিক ও শারীরিক যন্ত্রণা তাকে রোজ সহ্য করতে হতো| তার জীবন বন্দি ছিল ওই যে “ষ্টারওয়ালা রেটিংয়ে”| এইভাবে চলতে চলতে সে নিজের সবকিছুকে বন্দী করে ফেলে ডেলিভারির পরিবৃত্তে| জীবন যেন প্রতিটা ক্ষেত্রে তার থেকে নিংড়ে নিতে চায় পাঁচটা করে স্টার| সমস্ত ক্ষেত্রে, সমস্ত পরিস্থিতিতে জীবন তাকে মাপতে চায় সেই স্টার রেটিং এ| কতবার ভেবেছে জীবনটাকে শেষ করে দেবে, কিন্তু করতে পারেনি| মনে পড়ে গেছে মায়ের কথা, অমৃতা -সোহিনীর মুখটা| বারবার হেরে গেছে জীবন মরনের Tug-of-war এ| কিন্তু এমনটা তো হওয়ার কথা ছিল না| অরিজিত জীবনটাকে গুছিয়ে নিয়েছিল নাগপুরে| কথা দিয়েছিল সামনের বছর ওদের সবাইকে নিয়ে যাবে সেখানে| কিন্তু কাল হলো এই করোনা, লকডাউন আর কোম্পানির শাটডাউন নোটিশ| অরিজিতকে বাধ্য হয়ে ফিরতে হলো কলকাতায়| বেশ কিছুদিন বাড়িতে বসে থাকার পর এক বন্ধুর মাধ্যমে জানতে পারে  অ্যাপনির্ভর অনলাইন খাবার ডেলিভারির কথা| চুক্তিমতো একটি বাইক কিনে ফেলেছিল প্রথম মাসের মাইনে পাবার পর, যার ইএমআই সামনের মাস থেকে হয়তো বকেয়া পড়ে থাকবে| ছাত্রজীবনে বরাবরই পড়াশোনায় ভাল ছিল অরিজিত| কি মনে করে দুদিন আগে সোহিনীকে পড়ানোর সময় নিজের বইগুলোও খুঁজে বের করে| নিজেকে হারিয়ে ফেলে ক্লাস নাইন-টেনের ওই বইগুলোর মধ্যে| একটু একটু করে খুঁজতে থাকে বেঁচে থাকার রসদ| 

কিন্তু আজ তার সাথে যেটা হল কিছুতেই মেনে নিতে পারেনি অরিজিত| এমনিতেই আমাদের সমাজ ওদের এই কাজটাকে খুব ছোট চোখে দেখে, আশপাশ থেকে ভেসে আসে নানান মন্তব্য| কিন্তু কোনদিনই সে এসবের ধার ধারে না| আজ সে ডেলিভারি দিতে যায় বাইপাসের ধারে এক অভিজাত আবাসনে| ক’দিন  ধরেই খুব বৃষ্টি হচ্ছে শহরে, বাইপাস কানেক্টর এর আন্ডারওয়েগুলো জলের দখলে| তারপর সকাল থেকেই শরীরটা তার ভাল ছিল না|  টানা বৃষ্টিতে ভিজে জ্বর সর্দি মত হয়ে গেছে|  সকালে বেরোনোর সময় অমৃতা একটা প্যারাসিটামল দিয়েছিল খেতে, সেটা এখনো পকেটেই রয়ে গেছে| আবাসনের সঠিক ঠিকানায় পৌঁছে দরজায় টোকা দেয় সে| অপরপ্রান্ত থেকে কর্কশ ও রুষ্ট নারী কন্ঠে উত্তর আসে, “মহারাজার এতক্ষণে আসার সময় হয়েছে”| দরজা খুলে বেরিয়ে আসে বছর 22-23 এর এক যুবতী| আর তার সাথে সাথেই শুরু হয় অসহ্য গালিগালাজ, কারণ তার নাকি পৌঁছতে মিনিট দশেক দেরি হয়েছে| অরিজিত এই অনিচ্ছাকৃত ভুলের জন্য ক্ষমা চাইলেও সেই যুবতী বন্ধ করেনি তার কুকথার আস্ফালন| তাকে হুমকি দেয়া হয় সে যদি খাবারের দাম ফেরত না দেয় তাহলে তার বাইক এবং মোবাইল আটকে রাখা হবে| তাতে সে রাজি  না হওয়ায়, ঘটে তার জীবনের সবচেয়ে অপমানজনক ঘটনা| সেই যুবতী তার দিকে ছুঁড়ে দেয় খাবার ভর্তি টিফিন বাক্সটা| রাগে, দুঃখে, অপমানে মাটিতে মিশে যেতে ইচ্ছে করে অরিজিতের| শেষ অব্দি খাবারের দাম বাবদ 475 টাকা সেই যুবতীর হাতে তুলে দিয়ে পকেটের প্যারাসিটামল গলাধঃকরণ করে কোনরকমে বাড়ি ফিরে আসে| বাড়ি এসে অরিজিত কিছু খেতে পারেনা| অমৃতার অনেক জোরাজুরিতে কোনরকমে একটা রুটি খেয়ে উঠে পড়ে শোবার ঘরে চলে যায় সে|

এই ঘটনার পর কেটে গেছে বেশ কয়েকটা বছর| অরিজিত আজ সুপ্রতিষ্ঠিত, নিজ পরিশ্রম ও কর্মগুণে আজ সে সরকারি আমলা| মা আজ আর নেই| সেইসব মুহূর্তে যখন অরিজিত পরিশ্রম করছে, নিজের সাথে লড়াই করছে, একটা সরকারি চাকরি পাবার আশায়, তখনই সে হারিয়ে ফেলে মাকে|  হৃৎপিন্ডে কোন একটা সমস্যা হয়েছিল, কাউকে কোনদিনও জানতে দেয়নি| আসলে মায়েরা মনে হয় এরকমই, হয়, সবকিছুই বুকে লুকিয়ে রাখে| অমৃতা সমান ভাবে তার পাশে থেকে গেছে ,আজও| তাই ওর সাফল্যটা সবথেকে কাছ থেকে প্রত্যক্ষ করার অধিকার একমাত্র অমৃতারই| সোহিনী সামনের বছর মাধ্যমিক দেবে| এইসব ভাবতে ভাবতে সামনের দরজায় হালকা টোকা| এক নারীকন্ঠের প্রশ্ন, “আসতে পারি স্যার?” অরিজিত আসার নির্দেশ দিলে ভদ্রমহিলা ঘরে আসেন| ভদ্রমহিলাকে দেখে এক লহমায় সবকিছু মনে পড়ে যায় অরিজিতের| বছর পাঁচেক আগে সেই রাতের স্মৃতি ভেসে ওঠে তার মানসপটে| মনে মনে সে ধন্যবাদ জানায় ওই ভদ্রমহিলার সেই অপমানের| যা তাকে চাকরি ছাড়ার সিদ্ধান্তটা নিতে ত্বরান্বিত করে, যা তার জেদ বাড়িয়ে দেয়, যা তাকে রক্ত ঘাম ঝরানোর পরিশ্রম করে সরকারী আমলা হয়ে ওঠার অনুপ্রেরণা যোগায়| এই অপমানই তাকে ইস্পাতকঠিন করে তোলে, তার পারিবারিক সম্পর্ককে মজবুতি দেয় আর সবচেয়ে বড় কথা আজ তার সাফল্য এনে দেয়| অরিজিত স্বাভাবিক নিয়মে কুশল বিনিময় করে ভদ্রমহিলাকে সামনের চেয়ারে বসতে অনুরোধ করে| ভদ্রমহিলার হয়তো ঘটনাটা মনে আছে কারণ অরিজিত  তার চোখে লক্ষ্য করে ইতস্তত লজ্জা|  আর অরিজিতের চোখে ঠোঁটে মুখে  তখন বিজয়ীর চওড়া হাসি…||

লেখক পরিচিতি:-

লেখক শ্রী প্রতীপ কুমার হাজরা 1991 সালের 1 লা অক্টোবর হাওড়া শহরে জন্মগ্রহণ করেন| তার বিদ্যালয় জীবন অতিবাহিত হয় হাওড়ার সুবিখ্যাতবিবেকানন্দ ইনস্টিটিউশনে”| লেখক প্রাণিবিদ্যা বিষয়ে স্নাতক স্নাতকোত্তর স্তরে পড়াশোনা করেন যথাক্রমে কলিকাতা বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে| তার কর্মজীবনের শুরু 2016 সালে জীববিদ্যারএকজন শিক্ষক হিসেবে| তিনি তার কর্মজীবনের প্রায় দুবছর অতিক্রম করেন ছত্রিশগড় রাজ্যের রায়পুর শহরে| লেখক বর্তমানে হাওড়া জেলার লিলুয়া চকপাড়া অঞ্চলের শ্রী সারদা দেবী গার্লস প্রাইমারি স্কুলের সহকারী শিক্ষক পদে কর্মরত|