fbpx

fiction

ভালোবেসে সংসার করা- মিনাক্ষী মন্ডল

ভালোবেসে সংসার করা- মিনাক্ষী মন্ডল

সমাজে যে যার অবস্থান থেকে এক জন আরেক জনকে ঠকিয়ে চলেছে, ঠকছি সবাই। তবুও আমরা থেমে থাকি না বা নিজের  করণীয় সম্পর্কে সাবধানতা অবলম্বন করি না যে কি করা উচিত আর কি করা উচিত না।অথচ চোর পালালে বুদ্ধি বের হয় সকলের।কিছুদিন আগে এমনই একটা ঘটনা ঘটে গেল মনীষার জীবনে ।মনীষা হচ্ছে রায় বাড়ির একমাত্র পুত্রবধূ। সুন্দরী, শিক্ষিতা, বুদ্ধিমতী  মনীষার এই রায় বাড়িতে বউ হয়ে আসা পনেরো বছর হয়ে গেছে এরই মাঝে শ্বশুর-শাশুড়ি গত হয়েছেন।  সংসারের যাবতীয় কাজ মনীষা নিজের হাতে করে এরজন্য স্বামীর কাছে বাহবাও পায় খুব তাছাড়া সংসারে তার কথার দাম সকলেই দেয়।মনীষা নিজেও এতদিন ভালোবেসে শুধু সংসারই করে গেছে।হঠাৎ একদিন মনীষার বান্ধবীর ফোন এলো, সে জানালো ,’ অফিসের কাজে সে দু’দিনের জন্য কলকাতা আসছে, এই দু’দিন সে মনীষার বাড়িতেই থাকবে’ , খুব ভালো কথা ! মনীষার ও খুব আনন্দ হচ্ছে অনেকদিন পর বান্ধবী কে দেখবে।যথাসময়ে মনীষার বান্ধবী  বাড়িতে এলো, মনীষা লক্ষ্য করছে, তার বান্ধবী সোমার জীবনধারায় অনেক পরিবর্তন হয়েছে, নিজে রোজগার করে, জীবনের স্বাধীনতাও অনেক, এই স্বাধীনতায় অন্যরকম সুখ।    মনীষার বাড়ি থেকে আজ সোমা চলে গেল কিন্তু সোমার একটা কথা মনীষার মনের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে…     ‘সারাটা জীবন সংসার সংসার করেই কাটিয়ে দিবি ? জীবনে আর অন্য কিছুর আকাঙ্ক্ষা নেই তোর’ ?
সোমা যাবার পর, সোমার বলা কথা তার স্বামীকে মনীষা জানায়। আজকাল মনীষা মাঝে মাঝেই তার স্বামীকে শোনায়, ‘এই সংসারের জন্য আমি আমার  যোগ্যতা কে কোথাও কাজে লাগাতে পারিনি।’তারপরে একদিন মনীষা হঠাৎ মোবাইলে বিজ্ঞাপন দেখে,’ সিরিয়াল বা ছবিতে অভিনেতা অভিনেত্রী প্রয়োজন ,যদি কেউ ইচ্ছুক যোগাযোগ করতে পারে এই…. নম্বরে’।মনীষা ছোটবেলায় অনেক নাটক করেছে স্কুলে ,পাড়ার স্টেজে।অনলাইনে তাদের সাথে যোগাযোগ করে এবং তারা সেখানে মনীষাকে আড়াই হাজার টাকা সহ কিছু ডকুমেন্টস নিয়ে অফিসে যোগাযোগ করতে বলে । মনীষা তার স্বামীকে জানালে তার স্বামী কোন আপত্তি করে না বা করতে চায়নি সংসারের শান্তি বজায় রাখতে বরং সেদিন মনীষার স্বামী মনীষা কে সঙ্গে করে সেই ফিল্ম প্রোডাকশনে এর অফিসে নিয়ে যায়, সেখানকার হাবভাবে মনীষার স্বামী বুঝতে পেরেছিল যে এটা একটা লোক ঠকানো  প্রতারণার চক্র মাত্র তবুও কোন কথা না বলে স্ত্রী যাতে নিজের ভুল বুঝতে পারে তার জন্য ইচ্ছাকৃত ভাবে তাদের কথার জালে পা দিয়ে ট্রেনিং মারফত আড়াই হাজার টাকা দিয়ে আসে।সেই অফিস থেকে জানানো হয় তিন মাস পর্যন্ত সপ্তাহে একদিন ট্রেনিং দেওয়া হবে।পরের সপ্তাহে আবার মনীষার স্বামী মনীষাকে নিয়ে সেই অফিসে গেলে দেখে এত বড় তালা ঝুলছে, নম্বর অনুযায়ী ফোন করলে not reachable বলে।তারপর একদিন  তাঁরা মনীষার নম্বর  ব্লক দেয়।মনীষা সেই কাজের আশা ছেড়ে দিয়ে, স্বামীর কাছে ক্ষমা চেয়ে  বলে কোনদিন আর কোন কাজের চেষ্টা সে করবে না , সে জীবনে যা পেয়েছে সেটা নিয়ে সুখে থাকতে চায়।মনীষা স্বামী বলেন, ‘ওটা যে একটা প্রতারণা চক্র সেটা তুমি যে বুঝতে পারবে  আমি জানতাম। তাই সেদিন আমি বুঝতে পেরেও তাদের আড়াই হাজার টাকা দিয়ে এসেছিলাম’।  কথাটা শুনে মনীষার আরো রাগ হয়, সে বলে, ‘জেনে বুঝে এতোগুলো টাকা দিয়ে এলে’?মনীষার স্বামী বলে, “তোমাকে বোঝানোর জন্য এই মূল্যটা খুব কম এবং আরো বলে, তোমার বান্ধবীকে বলবে, সৎ পথে, ভালোবেসে করা কোন কাজ ছোট নয়”।মনীষা কাজের সন্ধানের গোঁয়ার্তুমিকে বিসর্জন দিয়ে আগের মতই ভালোবেসে সংসারে মন দিল,সেটাই তার বর্তমানে উপযুক্ত কাজ।এই সংসারটাও সুন্দর করে অনেকেই করতে পারেনা যেটা মনীষা পারে।

                   ।। সমাপ্ত।।

স্কুলের দিনগুলো- ইমরান খান রাজ

স্কুলের দিনগুলো- ইমরান খান রাজ

প্রতিদিনের মতো আজও ঠিক নয়টা বেজে পনেরো মিনিটে বাসা থেকে বের হলাম স্কুলের উদ্দেশ্যে। সাথে আমার প্রিয় নীল সাইকেলটা রয়েছে। ঠিক ১০টায় ক্লাস শুরু হলেও একটু আগে স্কুলে পৌঁছাতে হবে। কারন আগে যেতে না পারলে, নিজের পছন্দ মতো বেঞ্চে বসা যায় না ! বৈশাখে যেই পরিমাণ গরম পরে, এই গরমে রোজ রোজ স্কুলে যেতেও মন টানে না। কিন্তু কি আর করার ? স্কুলে না গেলেও যে আব্বুর হাতে মার খেতে হবে ! তাই বাধ্য হয়ে যেতে হয় মন না চাইলেও।

১৫ মিনিট প্যাডেল মারার পর অবশেষে পৌঁছে গেলাম স্কুলের মাঠে। মেহগনি গাছের সাথে সাইকেল তালা মারছিলাম, হঠাৎ পিছন থেকে ডাক এলো ! মামা! জানিনা ক্লাসের সবাই কোন আনন্দে আমাকে ‘মামা’ বলে ডাকতো ! পিছন ফিরে দেখি করিম চাচা। মুখে মুচকি হাসি নিয়ে আমার দিকে এগিয়ে আসছে। তার পিছু পিছু মনির আর সেলিমও রয়েছে। আসলে করিম আমাদের চেয়ে বয়সে একটু বড় ছিলো। তাই ক্লাসের সবাই ওকে করিম চাচা বলেই ডাকতো ! তিনজন একসাথে এসে আমাকে ঘিরে ধরলো। আমি কিছু জিজ্ঞেস করার আগেই ওরা জানালো যে, আজ ক্লাস করবো না ! স্কুল ফাঁকি দিয়ে এক গ্রামের দিকে ঘুরতে যাবে। সেখানে নাকি বড় বড় পুকুর, খেলার মাঠ, আখের বাগান আর অনেক নারিকেল গাছ আছে। সেখান থেকে ডাব আর আখ চুরি করে খাওয়া যাবে ! 

এতক্ষণে বুঝলাম ওদের উদ্দেশ্য। বাটপারগুলো কেনো একসাথে এসে আমাকে ঘিরে ধরলো সেটার মানে বোঝবার আর বাকি রইলো না আমার। ক্লাস নাইনের ছাত্র ছিলাম তখন আমরা। প্রতিদিন ক্লাস করাটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিলো আমাদের জন্য। সামনেই এস. এস. সি পরীক্ষার জন্য ব্যাপক প্রস্তুতি নিতে হবে আমাদের। কারন একটাই, সেটা হলো ভালো রেজাল্ট করতে হবে। বাসা থেকে সবার একটাই চাওয়া। ভালো রেজাল্ট করলে নাকি মোটরসাইকেল কিনে দিবে পাশাপাশি ঢাকার ভালো একটা কলেকে ভর্তি করে দিবে আরো কতো কি লোভনীয় অফার !

ক্লাস ফাঁকি দিয়ে ঘুরতে যাবার উত্তরে আমি না বলাতে তিনজনেই রাগ করলো আমার ওপর। ভবিষ্যতে আমি যদি তাদেরকে কোথাও নিয়ে যেতে চাই, তখন তারা নাকি আমার সাথে যাবেনা সাফ জানিয়ে দিলো। কি আর করার বাধ্য হয়েই রাজি হয়ে গেলাম। সারা দিলাম ওদের অযৌক্তিক ডাকে ! আমাকে ছাড়া নাকি এই ভ্রমণ-অভিযান জমবেই না ! তাহলে তো যেতেই হয়। এটাই তো বন্ধুত্ব। 

ইতিহাস, সাম্প্রদায়িকতা ও ব্রাহ্মণ্যতন্ত্র- নির্মলেন্দু কুণ্ডু

ইতিহাস, সাম্প্রদায়িকতা ও ব্রাহ্মণ্যতন্ত্র- নির্মলেন্দু কুণ্ডু

ভারতবর্ষের ইতিহাসের আলোচনা করতে বসলে ধর্মকে বাদ দেওয়া অসম্ভব ৷ ইতিহাসের যুগবিভাজন করতে বসলে যে প্রাচীন যুগের কথা আমরা পাই, সে সম্পর্কে জানার অন্যতম মূল উপাদান হল বৈদিক সাহিত্য, বিভিন্ন বৌদ্ধ ও জৈন গ্রন্থ ৷ এর পাশাপাশি রামায়ণ-মহাভারতের মতো কাব্যগ্রন্থ তথা ধর্মপুস্তকও অনেক ঐতিহাসিকের দৃষ্টিতে হয়ে পড়ে আকর ৷ সুতরাং ধর্মহীন প্রাচীন ভারত কল্পনাতীত ৷ আর সেই পরিপ্রেক্ষিতেই ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গী ভারত-ইতিহাস বর্ণনায় অন্যতম ভূমিকা নিয়ে থাকে ৷

আমরা প্রায়শই দেখে থাকি, প্রাচীন ঐতিহ্যের কথা বলতে গেলে আমরা সেই বেদকেন্দ্রিক ও ধর্মবহুল ইতিহাসের আলোচনাই শুরু করি ৷ যা  হিন্দু ধর্মকে মহিমান্বিত করে ৷ অপরদিকে মধ্যযুগের আলোচনা করতে বসলেই অবশ্যম্ভাবী হয়ে পড়ে মুসলিমদের এদেশে আগমন এবং হিন্দুদের সাথে তাদের বিরোধের ব্যাখ্যা-বিবরণ ৷ আর ঠিক এখানটাতেই আলোচনা শুরু করেছেন প্রাবন্ধিক পুলক চন্দ ৷ 
বর্ধমানের শ্যামসুন্দর কলেজের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক পুলকবাবু বাংলা সাহিত্য-সংস্কৃতি-ইতিহাসের বিবিধ বিষয়ে গবেষণামূলক গ্রন্থ লিখেছেন ৷ এর মধ্যে আমাদের আলোচ্য প্রবন্ধগ্রন্থটি ছাড়াও “ভিন্নপাঠে বন্দেমাতরম ও একটি দুষ্প্রাপ্য কাব্যগ্রন্থ”, “ব্রিটিশ ভারতে শিক্ষাষড়যন্ত্র” ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ ৷

বর্তমান ধর্মীয় পরিমন্ডলে দাঁড়িয়ে ধর্মীয় মৌলবাদের বিরুদ্ধে যুক্তিগ্রাহ্য ব্যাখ্যা প্রদানের উদ্দেশ্যেই এই গ্রন্থের অবতারণা ৷ প্রাবন্ধিক দেখিয়েছেন কীভাবে কিছু ‘সাম্প্রদায়িক’ ‘পক্ষপাতদুষ্ট’ ঐতিহাসিক ভারতের ইতিহাসে হিন্দু-মুসলিম বিরোধের কথা তুলে এক খন্ডিত ইতিহাস আমাদের সামনে তুলে ধরেছেন ৷ আর সেই খন্ডিত ইতিহাসকে আরও বিকৃত করছে কিছু উগ্র ধর্মান্ধ মানুষ তাদের সংকীর্ণ স্বার্থসিদ্ধির উদ্দেশ্যে ৷ তিনি কিছু উদাহরণ দিয়ে দেখিয়েছেন, মধ্যযুগে হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে সাধারণ মানুষের ওপর শোষণ ও অত্যাচার নেমে এসেছিল ও তা করেছিল হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে ভূম্যধিকারীরা ৷ আবার অ-মুসলিমদের কাছ থেকে প্রাপ্ত জিজিয়া কর চাপানোর উদ্দেশ্য ছিল রাজনৈতিক ৷ ধর্মান্তরন কোন ইসলাম ধর্মাবলম্বী শাসকের মূল কাজ ছিল না, বরং দলে দলে হিন্দুরা ‘সামাজিক সাম্য’ ও ‘উচ্চপদ পাওয়ার লোভে’ ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন ৷ কারন সুদীর্ঘকাল ধরে চলে আসা ব্রাহ্মণ্যশ্রেণীর সামাজিক-আর্থিক নিষ্পেশনে তারা দলিত হচ্ছিল ৷ প্রাবন্ধিক আরও দেখিয়েছেন, সমাজপতি ব্রাহ্মণ-উলেমাদের সাথে রাজ্যপতি রাজা-সুলতানদের সম্পর্ক কখনো ছিল এক সুতোয় গাঁথা, কখনো দ্বন্দ্বময় ৷ এবং অবশ্যই তা পারস্পরিক স্বার্থকেন্দ্রিক ৷

গ্রন্থের দ্বিতীয় রচনাটি অধ্যাপক অশোক রুদ্রের ‘ব্রাহ্মণ্য ভাবধারা ও আধুনিক হিন্দু মন’ গ্রন্থের সমালোচনা হিসেবে লেখা হলেও আলোচনার গুণে স্বতন্ত্র রচনা হিসেবে গ্রহণীয় ৷ এখানেও তিনি অধ্যাপক রুদ্রের বক্তব্যের বিরোধিতা করতে উপাদান হিসেবে বেছে নিয়েছেন বিভিন্ন ধর্মীয় ও তৎকেন্দ্রিক গ্রন্থাবলিকে ৷

ইতিহাসমাত্রই বহুকৌণিক ৷ একটা নির্দিষ্ট দৃষ্টিকোণ ইতিহাসে না থাকাটাই বাঞ্ছনীয় ৷ আর বর্তমান সময়ে দাঁড়িয়ে ব্রাহ্মণ্যতন্ত্র, মৌলবাদ, হিন্দু-মুসলিম সম্পর্কের মতো বিতর্কিত বিষয়ের ওপর এমন দৃষ্টিভঙ্গীর পরিচায়ক রচনা পাঠ সময়োপযোগী ও প্রাসঙ্গিক ৷ পাঠক হিসেবে আমাদের মনের ব্যাপ্তি ঘটাতে সাহায্য করবে গ্রন্থটি ৷ কিছু অবাঞ্ছিত বানান ভুল ও সামান্য গুরুগম্ভীর প্রেজেন্টেশন বাদ দিলে গ্রন্থটি যথেষ্ট উপভোগ্য ৷

লেখক পরিচিতি —
নির্মলেন্দু কুণ্ডু পেশায় শিক্ষক হলেও লেখালেখির শুরু সেই ছোট থেকেই ৷ ছোটবেলায় সূর্যসেনা পত্রিকায় লেখা প্রকাশ দিয়ে শুরু, তারপর পরবর্তী জীবনে এ রাজ্য ও ভিন রাজ্যের কিছু পত্রপত্রিকায় লেখা ছাপা হয় ৷ একটি কিশোর উপযোগী গল্প ছাপা হয়েছে আনন্দমেলা পত্রিকাতেও ৷ গল্পের পাশাপাশি কবিতা, প্রবন্ধ ইত্যাদি চর্চার সাথেও যুক্ত ৷ বর্তমানে আমাদের পদক্ষেপ পত্রিকার সম্পাদনার কাজে যুক্ত ৷ শুরু হয়েছে আমাদের পদক্ষেপ প্রকাশনীর কাজও ৷ ইতিমধ্যে ‘এক টুকরো আয়না’, ‘অণুগল্প ১০০’ নামক দুটি সংকলনগ্রন্থে গল্প ও ‘কবিতা স্টেশন’ গ্রন্থে কবিতা প্রকাশিত হওয়ার পাশাপাশি প্রকাশিত হয়েছে একক কবিতার বই ‘রোমন্থন’ ও একক গল্পের বই (পিডিএফ আকারে) ‘১৬ আনা’ ৷

বন্ধু তোমায় – শুভজিৎ চট্টোপাধ্যায়

বন্ধু তোমায় - শুভজিৎ চট্টোপাধ্যায়

ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে বৃষ্টি ভেজা শহরের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে মনটা খারাপ হয়ে গেল চন্দ্রিমার।
 ঝমঝম করে বৃষ্টি পড়ছে। এই ব্যালকনিটাতে দাঁড়ালে অনেকটা দূর অবধি দেখা যায়। বিস্তৃত সড়ক, উড়ালপুল— সব এখন শুনশান। এ লকডাউন যে আর কতদিন চলবে..! চন্দ্রিমা একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে। 
  দক্ষিণ কলকাতার অভিজাত এই আবাসনের দু’খুপরির ফ্ল্যাটে একাই থাকে চন্দ্রিমা। চল্লিশোর্ধ বয়সে কোনো কিছুর অভাব না থাকলেও, এই নিঃসঙ্গতার হাতছানি তাকে বড্ড পীড়া দেয়। দীর্ঘ চার-পাঁচ বছর ধরে প্রতিদিন ডিপ্রেশানের ওষুধ গিলে তাকে বেঁচে থাকতে হচ্ছে। মলয়ের সঙ্গে ডিভোর্সটা হয়ে যাওয়ার পর থেকেই এইসব রোগ আরও যেন মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। 
  আগে তবুও বাইরে বেরোনোর একটা স্বাধীনতা ছিল। কিন্তু এখন এই বন্দি জীবন…।
  কত আর সোশ্যাল মিডিয়া নিয়ে থাকবে? ফোন করে সময় কাটানোর লোকও আর কোথায়? চন্দ্রিমা দেখেছে মা-বাবা চলে যাওয়ার পর বাকি সম্পর্কগুলোও কেমন যেন ঢিলে-ঢালা হয়ে গেছে। নিজের মানসিক দুঃখ, অবসাদ ভাগ করে নেওয়ার জন্য ওর কোনো বন্ধু নেই। সবাই তাকে এড়িয়ে যেতে চায়। ফোন করার প্রয়োজনীয়তা দেখায় না তেমন। চন্দ্রিমার স্মার্টফোনের রিংটোনে আর বেজে ওঠে না চন্দ্রবিন্দুর গান— ‘বন্ধু তোমায়…’ ।
  অথচ ফেসবুকে কিছু পোস্ট করলে লাইক, কমেন্টের বন্যা বয়ে যায়। আচ্ছা, যারা এত লাইক দেয়, কমেন্ট করে, ওরাও তো বন্ধু, নাকি শুধুই পরিচিত? তাদের সঙ্গে মনের সব কথা শেয়ার করার কি কোনো পরিসর নেই? বোধহয় নেই। নাহলে চার হাজার বন্ধু, আর কয়েক শো ফলোয়ার নিয়েও এই নিঃসঙ্গতা কেন?
তেমনই একটা সন্ধ্যে। লকডাউন। বাইরে বৃষ্টি পড়ছে। হঠাৎ একটা ফেসবুক পোস্ট। তারপরই ফেসবুক লাইভে ভেসে উঠল চন্দ্রিমার মুখ। ফ্যাকাসে, রুগ্ন। ল্যাম্পের হলদেটে আলোয় চন্দ্রিমার পেছনে সিলিং থেকে কী একটা যেন ঝুলতে দেখা যাচ্ছে। 
  চন্দ্রিমা টেবিলের ওপর ফোনটা সেট্ করে বিছানায় গিয়ে দাঁড়াল। এবার স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে সবকিছু। সিলিং-এর থেকে এতক্ষণ যেটা ঝুলতে দেখা গেছে সেটা একটা কাপড়ের ফাঁস। একী! এটা কী করছে চন্দ্রিমা!
 বিছানায় একটা টুলের ওপর দাঁড়িয়ে ফাঁসটা গলায় গলিয়ে নিয়েছে সে। মুহূর্তের দমকা বাতাসে ফোনটা ছিটকে পড়ল মেঝেতে। একটা গোঙানির শব্দ…
চুড়মার হয়ে যাওয়া মোবাইলের স্ক্রিনে শুধু ঝুলন্ত দু’টো পা। নিথর।
বৃষ্টির শব্দকে ছাপিয়ে একনাগাড়ে ফোনটা বেজে যাচ্ছে আজ। সেই রিংটোন…চন্দ্রবিন্দুর গান…‘বন্ধু তোমায় এ গান শোনাব বিকেল বেলায়…বন্ধু তোমায়…।’
কেউ ধরছে না আর…।

দুই মিত্র ও গুরুদক্ষিণা – অমৃতা ব্যানার্জী

দুই মিত্র ও গুরুদক্ষিণা - অমৃতা ব্যানার্জী

আর্যাবর্তের দ্বারে সন্ধিক্ষণ সমাগত। প্রারম্ভ হয়েছে কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ, যা সর্বকালের শ্রেষ্ঠ যুদ্ধ “মহাভারত” আখ্যায় চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। মহান কুরুবংশ আজ দ্বিধা বিভক্ত। পিতামহ, গুরু, ভ্রাতা, সখা – সকল আপনজন পরস্পরের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণ করেছে। স্বয়ং শ্রীকৃষ্ণ পাণ্ডবশ্রেষ্ঠ অর্জুনের সারথী রূপে তাঁকে দিশা প্রদর্শন করছেন। মহান ভারতভূমিও আজ দ্বিধা বিভক্ত। ভারতভূমির মহান সম্রাটগণ তথা বীরযোদ্ধারা আজ বিভক্ত হয়ে কৌরব ও পাণ্ডব দলে যোগদান করেছে। রণক্ষেত্রের দিকে দিকে কেবল শবের সমাহার, রুধির-ধারা। রমণী ও শিশুদের ক্রন্দনে উদ্বেলিত দিগ্বিদিক। ধ্বংসলীলা প্রত্যক্ষ করে স্তম্ভিত পবিত্র ভারতভূমি। একটি বংশের ভ্রাতৃদ্বন্দ্ব সমগ্র আর্যাবর্তকে করছে আলোড়িত, নিশ্চিহ্ন হচ্ছে সর্বস্ব। কিন্তু এই ধ্বংসলীলার জন্য কি কেবল কৌরব ও পাণ্ডবের পারস্পরিক শত্রুতা দায়ী? অথবা বহুপূর্বেই কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের বীজ বপন করা হয়েছিল? সেই রোপণ কার্য ছিল অজ্ঞাত। কেবল কাল প্রত্যক্ষ করেছিল অঙ্কুরোদগম।

পাঞ্চাল রাজ্য থেকে সামান্য দূরে অবস্থিত ঋষি অগ্নিবেশ্যর আশ্রম। আশ্রমে বসবাসকারী ঋষি অগ্নিবেশ্যর দুই প্রিয় শিষ্য – মহর্ষি ভরদ্বাজের পুত্র দ্রোণ এবং পাঞ্চালরাজ পৃষতের পুত্র দ্রুপদ।  দ্রুপদ রাজপুত্র। সিংহাসন, সাম্রাজ্য তার ভবিতব্য। কিন্তু দ্রোণের সম্মুখে প্রতীক্ষারত কঠিন ভবিষ্যত। ব্রাহ্মণ-সন্তান হয়েও দ্রোণের মধ্যে ক্ষত্রিয়ের গুণ প্রকট। ব্রাহ্মণের নিত্য কর্ম – পূজা, যজ্ঞ, সাধনা, তাকে আকর্ষণ করে না। অস্ত্রের প্রতি তার প্রবল আকর্ষণ। তাই অস্ত্রশিক্ষা লাভের উদ্দেশ্যে দ্রোণ ঋষি অগ্নিবেশ্যর শিষ্যত্ব গ্রহণ করেছে। ব্রাহ্মণের ক্ষাত্রগুণ সমাজ সহজে গ্রহণ করে না। অগত্যা দ্রোণের পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতিও তার প্রতিকূলে। দুই কিশোরের সামাজিক স্তর সম্পূর্ণ ভিন্ন। কিন্তু তারা বন্ধু, বাল্যবন্ধু। বাল্যাবস্থায় মহর্ষি ভরদ্বাজের আশ্রমে ভ্রমণের উদ্দেশ্যে আসত দ্রুপদ। সেই সময় হতে উভয়ের বন্ধুত্ব। ঋষি অগ্নিবেশ্যর আশ্রমে সেই বন্ধুত্ব প্রগাঢ় হয়েছে। দ্রোণের ভবিষ্যত কাঠিন্যে পরিপূর্ণ। অস্ত্র প্রেমের জন্য সমাজের সঙ্গে বারংবার দ্বন্দ্বের সম্মুখীন হতে হবে তাকে। দ্রুপদ দ্রোণের সমস্যা সম্পর্কে অবগত। অগত্যা বন্ধুত্বের মর্যাদা রক্ষার জন্য সে দ্রোণকে দেয় এক প্রতিশ্রুতি, ‘দ্রোণ, তুমি আমার পরম মিত্র। আজ হতে যাহা আমার, তাহাই তোমার। ভবিষ্যতে আমার সিংহাসন ও রাজ্যের উপরও তোমার থাকবে সমান অধিকার।’ দ্রুপদের কথন শেষে দুই বন্ধু পরস্পরকে আলিঙ্গন করল। অলক্ষ্যে হাসল নিয়তি।

সময় সদাপ্রবহমান। ঋষি অগ্নিবেশ্যর আশ্রমে অস্ত্রশিক্ষা গ্রহণের পর অতিবাহিত হয়েছে বেশ কিছু বছর। ব্রহ্মচর্য ত্যাগ করে দ্রোণ এবং দ্রুপদ, উভয়ই গৃহস্থ জীবনে প্রবেশ করেছেন। দ্রুপদ এখন পাঞ্চাল সম্রাট। সুখ, স্বাচ্ছন্দ্য, বিলাসিতা সবই তাঁর করায়ত্ত। বিপরীতে দ্রোণের জীবন কণ্টকাকীর্ণ। কুরুবংশের কুলগুরু কৃপাচার্যের ভগিনী কৃপীর সহিত দ্রোণ বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছেন। এসেছে তাঁদের একমাত্র সন্তান অশ্বত্থামা। কিন্তু দ্রোণের ছোট্ট নীড় সুখের নয়, তাতে বাস করে চরম বেদনা। যাগযজ্ঞ থেকে দূরে থাকা ব্রাহ্মণকে ব্রাহ্মণ সমাজ সহজে গ্রহণ করে না। দ্রোণ কর্মহীন। তাঁর জীবনের কানায় কানায় পরিপূর্ণ দারিদ্র্য। আপন পুত্র অশ্বত্থামাকে তিনি এক চিলতে দুধ পর্যন্ত দিতে পারেন না। প্রতি মুহূর্তে বিদীর্ণ হয় পিতৃহৃদয়। দ্রোণ বোঝেন, এই রূপে জীবন অতিবাহিত করা অসম্ভব। উপার্জনের পন্থা খোঁজা আবশ্যিক। সহসা দ্রোণের বাল্যবন্ধু দ্রুপদের কথা স্মরণে আসে। সে তো বলেছিল, তার সবকিছুতে দ্রোণের সমান অধিকার। দ্রুপদ আজ সম্রাট। অবশ্যই সে তার পূর্ব প্রতিশ্রুতি বিস্মৃত নয়। অগত্যা পাঞ্চাল প্রস্থান করার সিদ্ধান্ত নেন দ্রোণ।

স্ত্রী, পুত্র সহ পাঞ্চালরাজ দ্রুপদের ভবনে প্রবেশ করেন দ্রোণ। বাল্যবন্ধুকে আলিঙ্গন করার জন্য ধাবিত হন তিনি। কিন্তু দ্রুপদের মধ্যে কোন প্রকার উচ্ছ্বাস পরিলক্ষিত হল না। দ্রোণের আগমন দ্রুপদের কাছে কেবল রাজভবনে এক সাধারণ ব্রাহ্মণের আগমন মাত্র। দ্রোণ দ্রুপদকে পূর্ব অঙ্গীকারের কথা স্মরণ করানোর প্রচেষ্টা করলেন। সবকথা শুনে বিদ্রুপাত্মক স্বরে দ্রুপদ বললেন, ‘হে ব্রাহ্মণ, বাল্যাবস্থার কথা কেইবা স্মরণে রাখে? আপনি ব্রাহ্মণ। সপরিবারে আমার দ্বারে আগত। আপনাকে একটি দিনের জন্য আমার ভবনে বিশ্রাম করার অনুমতি দিতে পারি। এর অধিক কিছু নয়। রাজসিংহাসনে আপনার কোন অধিকার নেই।’

চরম অপমানিত বোধ করলেন দ্রোণ। তাঁর পরম মিত্র আজ এইরূপে তাঁকে অপমানিত করল! ভিক্ষুকের ন্যায় এক মুহূর্তের জন্যও তিনি পাঞ্চালরাজের ভবনে থেকে আশ্রয় ভিক্ষা করবেন না। পরিবারের সঙ্গে তৎক্ষণাৎ রাজভবন ত্যাগ করলেন দ্রোণ। কিন্তু তাঁর হৃদয়ে প্রজ্বলিত হল অপমানের অগ্নি। অপমানের প্রতিকার না করা পর্যন্ত সেই অগ্নি নির্বাপিত হবে না। 

দ্রোণ বর্তমানে আশ্রয়হীন। প্রয়োজন আশ্রয় এবং উপার্জনের পন্থা। উপার্জন করে দ্রুপদকে যোগ্য উত্তর দিতে অঙ্গীকারবদ্ধ হলেন দ্রোণ। আশ্রয়ের কথা ভাবামাত্র দ্রোণের স্মরণে এলেন কৃপাচার্য। তাঁর শ্যালক কৃপাচার্য কুরুবংশের কুলগুরু। হস্তিনাপুরে নিজ গৃহে স্বাচ্ছন্দ্যে জীবন অতিবাহিত করেন তিনি। অগত্যা হস্তিনাপুর গমনের সিদ্ধান্ত নেন দ্রোণ। 

কিছুকাল যাবৎ সপরিবারে কৃপাচার্যের গৃহে বসবাস করছেন দ্রোণ। কিন্তু উপার্জনের পন্থা এখনও তিনি নির্ধারণ করতে পারেননি। এমতাবস্থায় একটি সংবাদ তাঁর কর্ণগোচর হল। মহামতি ভীষ্ম কুরু রাজপুত্রদের অস্ত্রশিক্ষার বিষয়ে চিন্তিত।

মহারাজ ধৃতরাষ্ট্রের শত পুত্র। স্বর্গীয় মহারাজ পাণ্ডুর পাঁচ পুত্র। সকল রাজকুমার কিশোর। কিন্তু এখনও তাদের উপযুক্ত অস্ত্রশিক্ষা প্রারম্ভ হয়নি। কৃপাচার্য ও বিদুরের কাছে তারা অস্ত্রশিক্ষা লাভ করে ঠিকই, কিন্তু মহামতি ভীষ্ম সন্তুষ্ট নন। তাঁর ইচ্ছা, কুরু রাজকুমারেরা হোক জগতের শ্রেষ্ঠ যোদ্ধা। শ্রেষ্ঠ যোদ্ধা নির্মাণের জন্য প্রয়োজন শ্রেষ্ঠ গুরু। মহামতি ভাবেন, কোথায় সেই শ্রেষ্ঠ গুরু?

মহামতি ভীষ্মের ইচ্ছের কথা জ্ঞাত হওয়া মাত্র জীবনের নতুন দিশা সন্ধান পেলেন দ্রোণ। অস্ত্রবিদ্যায় তিনি শ্রেষ্ঠ। মহর্ষি ভরদ্বাজের আগ্নেয়াস্ত্রের অধিকারীও তিনি। অগত্যা তাঁর চেয়ে শ্রেষ্ঠ অস্ত্রগুরু কেইবা হতে পারে?

অন্তরালে থেকে কুরু রাজকুমারদের পর্যবেক্ষণ করলেন দ্রোণ। রাজকুমাররেরা বুদ্ধিমান অবশ্যই, কিন্তু সঠিক পথপ্রদর্শকের প্রয়োজন। নল-খাগড়ার দ্বারা নির্মিত শরের সাহায্যে গভীর কুয়ো থেকে ক্ষুদ্র ক্রীড়নক উদ্ধার করে রাজকুমারদের চমৎকৃত করলেন দ্রোণ। 

রাজকুমারগণের থেকে আশ্চর্য ব্রাহ্মণ সম্পর্কে অবহিত হলেন মহামতি ভীষ্ম। বুঝলেন, সেই ব্রাহ্মণ  মহর্ষি ভরদ্বাজের পুত্র দ্রোণ ব্যতীত অন্য কেউ হওয়া অসম্ভব। মহামতি ভীষ্ম দ্রোণের ক্ষাত্রগুণ সম্পর্কে যথেষ্ট অবহিত। অগত্যা মহামতির নিবেদনে দ্রোণ কুরু রাজকুমারদের অস্ত্রগুরু রূপে নিযুক্ত হলেন। 

হস্তিনাপুরের শেষ প্রান্তে নির্মিত হল আশ্রম। সেই আশ্রমে প্রারম্ভ হল রাজকুমারদের অস্ত্রশিক্ষা। দ্রোণের নব পরিচয় দ্রোণাচার্য।

অতিবাহিত হল বেশ কিছু বছর। কুরু রাজকুমারগণের অস্ত্রশিক্ষা সম্পূর্ণ হয়েছে। দ্রোণাচার্যের শিক্ষা লাভ করে তারা এখন মহাপরাক্রমী যোদ্ধা। কিন্তু বাস্তবিক রণক্ষেত্রের জ্ঞান তাদের নেই। রণক্ষেত্রের জন্য তারা ঠিক কতটা প্রস্তুত, তা পরীক্ষা করা বাঞ্ছনীয়।

দ্রোণাচার্য বুঝলেন, উপযুক্ত সময় সমাগত। এইবার শিষ্যরা তাঁর হৃদয়ে প্রজ্বলিত অপমানের বহ্নিশিখা নির্বাপিত করবে। এই সুযোগে তাদের অন্তিম পরীক্ষাও নেওয়া যাবে।

মহামতি ভীষ্ম এবং মহারাজ ধৃতরাষ্ট্রের সম্মুখে দ্রোণাচার্য ব্যক্ত করলেন তাঁর কথা। শিষ্যদের কাছে গুরুদক্ষিণা চাই তাঁর। গুরুদক্ষিণা স্বরূপ, কুরু রাজকুমাগণ পাঞ্চাল রাজ্য আক্রমণ করে পাঞ্চালরাজ দ্রুপদকে পরাভূত করবে। গুরুদক্ষিণা ব্যতীত শিক্ষা অসম্পূর্ণ। অগত্যা কুরুবংশ দ্রোণাচার্যকে তাঁর কাঙ্ক্ষিত গুরুদক্ষিণা দিতে স্বীকৃত হল।

কুরু রাজকুমারগণ পাঞ্চাল রাজ্য আক্রমণ করলেন। কাম্পিল্য নগরীর থেকে সামান্য দূরে যুদ্ধ প্রারম্ভ হল। 

পাণ্ডবশ্রেষ্ঠ অর্জুনের নিকট নতিস্বীকার করতে বাধ্য হলেন মহারাজ দ্রুপদ। দ্রুপদকে হত্যা করলেন না অর্জুন। হস্তিনাপুরের সঙ্গে পাঞ্চালের পূর্ব আত্মীয়তার জন্য অর্জুন দ্রুপদকে অসম্মান করলেন না। কেবল গুরুদক্ষিণার দায়বদ্ধতার জন্য তাঁকে দ্রোণাচার্যের পদতলে নিয়ে এলেন।

শান্ত হল দ্রোণাচার্যের হৃদয়ে প্রজ্বলিত অগ্নি। পাঞ্চাল রাজ্য অধিকার করলেন তিনি। কিন্তু বাল্যবন্ধুকে সম্পূর্ণ রূপে রাজ্যচ্যুত করলেন না তিনি। দ্বিখণ্ডিত হল পাঞ্চাল রাজ্য। গঙ্গার উত্তর দিক অধিগ্রহণ করলেন দ্রোণাচার্য এবং দক্ষিণ দিকের অধিকার রইল দ্রুপদের।

রণক্ষেত্র শান্ত। কিন্তু অপমানের অগ্নি প্রজ্বলিত হল দ্রুপদের হৃদয়ে। তিনি দ্রোণাচার্যকে অপমানের প্রত্যুত্তর দিতে অঙ্গীকারবদ্ধ হলেন। দ্রুপদ কামনা করলেন এক পুত্র, যে দ্রোণের শিরশ্ছেদ করবে। কাঙ্ক্ষিত পুত্র লাভের জন্য প্রারম্ভ হল এক মহাযজ্ঞ। সেই যজ্ঞের অগ্নি হতে এক পুত্রর সহিত জন্ম নিল এক কন্যা। আর্যাবর্তের আমূল পরিবর্তনের জন্য ধরণীতে এলেন দ্রৌপদী।

দুই মিত্রর পারস্পরিক দ্বন্দ্ব ও এক গুরুদক্ষিণা বদলে দিল আর্যাবর্তের কাহিনী। প্রারম্ভ হল “মহাভারত”।

লেখক পরিচিতি:

অমৃতা ব্যানার্জী পেশায় একজন তথ্য প্রযুক্তি ইঞ্জিনিয়ার। সাহিত্য জগত, বিশেষতঃ বাংলা সাহিত্যের প্রতি অমৃতার প্রবল আকর্ষণ। বিভিন্ন লিটল ম্যাগাজিন ও গল্প সংকলনে তাঁর লেখা প্রকাশিত হয়েছে এবং ভবিষ্যতের জন্য নির্বাচিত হয়েছে।

আশাপূর্ণা – অন্তরা চন্দ্র

আশাপূর্ণা - অন্তরা চন্দ্র

       ছয় বছরের ছোট্ট মেয়েটা নতুন জামা গায়ে দিয়ে অষ্টমীর সকালে মন্ডপে অঞ্জলী দিতে আসে। পূজোয় তার প্রতি বছর এই একটা করেই নতুন জামা হয়। বাবা পছন্দ করে কিনে এনে দেয়। অষ্টমীর দিন ভাঁজ ভেঙে পরপর তিন দিন ওই জামা‌টা পরেই সে মন্ডপে যায় এবং সেখানেই তার সারাদিন কাটে। বাড়িতে মা নিজের হাতে মাটির গয়না তৈরী করে, খুব যত্ন নিয়ে কয়েক মাস ধরে গয়না গুলোতে রং চাপায়, আর মেয়েটা সেগুলো সারাটা পূজো জুড়ে মন্ডপের সামনে বিক্রী করে।

       আজ দশমী। পূজো টা আনন্দে কেটেছে। অনেক ভালো ভালো দিদিরা সব ঠাকুর দেখতে এসেছিল। তারা বেশ কিছু গয়না কিনেছে। মা খুব খুশি, বলেছে লক্ষী পূজোর দিন এবার লুচি করবে। তার উপর সে গত দুদিন থেকে শুনছে যে এই বছর বিজয়া তে ওদের প্যান্ডেল প্রাইজ পাবে। ছোট শহরের পূজো গুলির মধ্যে তাদের প্যান্ডেল অন্যতম সেরা হয়েছে। এত সব খবর পেয়ে মেয়ে আহ্লাদে আটখানা। 

       একদল দাদা দিদি এসে মন্ডপের বাইরে দাঁড়িয়ে আইসক্রিম খাচ্ছিল। আজ গয়না বেচতে তেমন মন নেই। তবু মায়ের কথা ভেবে সে পায়ে পায়ে এগিয়ে গেল। মায়ের শেখানো লাইনটা ও সবাইকেই বলে।

  • দিদি তোমরা মাটির গয়না নেবে? তোমাদের এই শাড়ি আর কুর্তির সাথে খুব মানাবে।

গয়না গুলো তে চোখ বুলিয়ে একজন বলল, “কত করে এগুলো?”

  • এই কানের দুল তিরিশ টাকা করে। আর গলার হারের সাথে নিলে পুরো সেট পঞ্চাশ টাকা পড়বে।

তারা‌ কয়েকটি গয়না হাতে নিয়ে দেখতে দেখতে নিজেদের মধ্যে কথা বলে, “জাস্ট দেখ, মলে গেলেই এগুলোর পাঁচ ডবল দাম। মেটিরিয়াল টাও এমন অরগ্যানিক নয়। অথচ এগুলো কত বেশী ইউনিক অ্যান্ড অরিজিনাল।”

অন্য একটা দিদি বলল, “আমায় ওই হলুদ পাখি আঁকা টা একবার দেখা।” 

  • এই নাও। এটা কেনো দিদি। আমার মায়ের বানানো সব। তোমার এই শাড়ি টা খুব সুন্দর। এর সাথে তোমায় দারুন লাগবে।
  • তাই বুঝি? তোর জামাটাও তো খুব সুন্দর। কে কিনে দিয়েছে?
  • বাবা এনেছে। এটা আমার নতুন জামা।

“বাহ। খুব ভালো। কি নাম তোমার?”, অন্য একজন প্রশ্ন করে।

  • (লজ্জা পেয়ে) আমার নাম আশা।
  • খুব সুন্দর নাম। 

কথার আদরে উচ্ছসিত হয়ে ওঠে আশা।

  • জান, আজ সন্ধ্যাবেলা আমাদের প্যান্ডেলকে প্রাইজ দেবে। আমার বাবাও প্রাইজ পাবে।
  • তাই? তোমার বাবাও পাবেন?
  • হ্যাঁ গো। যারা সব থেকে সুন্দর প্যান্ডেল করেছে তাদেরকে দেবে। এই প্যান্ডেলটা তো আমার বাবা তৈরী করেছে। এই বাঁশ কাপড় সব নিজের হাতে বেঁধেছে। প্রতি বছর করে। আমি পূজোর আগে দেখতে আসি বাবার কাজ।
  • ওহ্ . . . আচ্ছা বেশ . . . সে নাহয় সন্ধ্যাবেলা হবে। এখন বরং তুই আমাদের সাথে একটা আইসক্রিম খা। 

ওরা আশাকে আইসক্রিম কিনে দেয়। সে খেতে খেতে ভাবে মা কে বলতে হবে আজ দুধ আইসক্রিম খেয়েছে।

       সন্ধ্যা নেমে আসে। আশার আর তর সইছে না। বাবা কি প্রাইজ পাবে কে জানে। রাত আটটার পরে বাইরে থাকা নিষেধ। সে বাড়ি ফিরে মায়ের কাছে আবদার করে। বাবার প্রাইজের আনন্দে পাড়ার কাকুর দোকান থেকে কাল একটা ছোট প্যাকেটের বিরিয়ানি কিনে খাবে। মা বাবা কেও তার থেকে একটু করে ভাগ দেবে। মা বলে সে হবে ক্ষণ। আশা অধীর অপেক্ষায় বসে থাকে। 

       রাত দশটা নাগাদ বাবা বাড়ি ঢোকে। আশা ছুটে যায়।

  • প্রাইজ পেয়েছ তোমরা?
  • হ্যাঁ মা, আমরা দ্বিতীয় হয়েছি। আমাদের পূজো এবছর খুব ভালো হয়েছে।
  • কই দেখি কি প্রাইজ পেলে?

আশাকে কোলে তুলে নিয়ে বাবা হাসি হাসি মুখে তার হাতে বিরিয়ানির একটা বড় প্যাকেট দেয়। 

  • আমায় এটা দিয়েছে। এইটা আমাদের প্রাইজ!
  • এটা তো খাবার জন্য কিনে দিয়েছে। আজ যেমন ভালো দাদা দিদিরা আমায় আইসক্রিম কিনে দিয়েছিল। তুমি যে এত সুন্দর করে কাজ করলে, তার জন্য তোমায় কোনো আসল প্রাইজ দেয়নি বাবা?

মেয়ের ছলো ছলো চোখের দিকে তাকিয়ে বাবা হেসে ওঠে, “আমার আসল প্রাইজ তো তুই রে মা! তুই আমার মা দুর্গা! আমি যে প্যান্ডেল তৈরী করি,‌ তার ভিতরে তো আমি তোকেই দেখতে পাই।”

       বাবার কথা শুনে আশার চোখের জল মিলিয়ে যায়। মা দুর্গা হলে তো তার কাঁদা চলে না। তাকে আরো শক্তিশালী হতে হবে। সিংহের পিঠে চড়ে হাতে অস্ত্র নিয়ে অসুর বধ করতে হবে যে . . . !

অনুঘটক – শ্রী প্রতীপ কুমার হাজরা

অনুঘটক - শ্রী প্রতীপ কুমার হাজরা

অরিজিত কি মনে করে মেইলের সেন্ড বাটন টা টিপে দিল| তার চাকরির ইস্তফাপত্র বলে কথা| কদিন ধরেই যা তার ড্রাফটে ঘোরাফেরা করছিল| সেন্ড সাকসেসফুলি মেসেজটা আসতেই তার চোখের কোনটা চিক চিক করে উঠলো| এক ফোটা চোখের জল নিজের অজান্তেই গালে নেমে এলো| সবার অলক্ষ্যে তা মুছে ফেলল অরিজিত|  পাশেই শুয়ে অমৃতা, এক ঝলক তার দিকে তাকিয়ে মোবাইল ফোনটা লক করে শুয়ে পড়ল সে| এপাশ-ওপাশ করতে করতে কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছে বুঝতেই পারেনি, অথচ তার বোঝাটাই সবচেয়ে বেশি দরকার ছিল| হঠাৎ করে ঘুম ভেঙে গেল অরিজিতের| না কোন স্বপ্ন নয়, কিছুক্ষণ আগেই ইস্তফা পত্র পাঠিয়েছে ম্যানেজার আর কোম্পানির হেড অফিসে| অজানা উত্তেজনায় ঘামে ভিজে যায় তার শরীর, গলা বুজে আসতে চায়| সংসারের দায়িত্ব, মায়ের শরীর, অমৃতার আবদার, সোহিনীর পড়াশোনার খরচ সে চালাবে কি করে? এক বিরাট প্রশ্নচিহ্নের মুখে দাঁড়িয়ে তার ভবিষ্যৎ| কিন্তু পরক্ষনেই তার মনে পড়ে যায় কি দুর্বিষহ মানসিক ও শারীরিক যন্ত্রণা তাকে রোজ সহ্য করতে হতো| তার জীবন বন্দি ছিল ওই যে “ষ্টারওয়ালা রেটিংয়ে”| এইভাবে চলতে চলতে সে নিজের সবকিছুকে বন্দী করে ফেলে ডেলিভারির পরিবৃত্তে| জীবন যেন প্রতিটা ক্ষেত্রে তার থেকে নিংড়ে নিতে চায় পাঁচটা করে স্টার| সমস্ত ক্ষেত্রে, সমস্ত পরিস্থিতিতে জীবন তাকে মাপতে চায় সেই স্টার রেটিং এ| কতবার ভেবেছে জীবনটাকে শেষ করে দেবে, কিন্তু করতে পারেনি| মনে পড়ে গেছে মায়ের কথা, অমৃতা -সোহিনীর মুখটা| বারবার হেরে গেছে জীবন মরনের Tug-of-war এ| কিন্তু এমনটা তো হওয়ার কথা ছিল না| অরিজিত জীবনটাকে গুছিয়ে নিয়েছিল নাগপুরে| কথা দিয়েছিল সামনের বছর ওদের সবাইকে নিয়ে যাবে সেখানে| কিন্তু কাল হলো এই করোনা, লকডাউন আর কোম্পানির শাটডাউন নোটিশ| অরিজিতকে বাধ্য হয়ে ফিরতে হলো কলকাতায়| বেশ কিছুদিন বাড়িতে বসে থাকার পর এক বন্ধুর মাধ্যমে জানতে পারে  অ্যাপনির্ভর অনলাইন খাবার ডেলিভারির কথা| চুক্তিমতো একটি বাইক কিনে ফেলেছিল প্রথম মাসের মাইনে পাবার পর, যার ইএমআই সামনের মাস থেকে হয়তো বকেয়া পড়ে থাকবে| ছাত্রজীবনে বরাবরই পড়াশোনায় ভাল ছিল অরিজিত| কি মনে করে দুদিন আগে সোহিনীকে পড়ানোর সময় নিজের বইগুলোও খুঁজে বের করে| নিজেকে হারিয়ে ফেলে ক্লাস নাইন-টেনের ওই বইগুলোর মধ্যে| একটু একটু করে খুঁজতে থাকে বেঁচে থাকার রসদ| 

কিন্তু আজ তার সাথে যেটা হল কিছুতেই মেনে নিতে পারেনি অরিজিত| এমনিতেই আমাদের সমাজ ওদের এই কাজটাকে খুব ছোট চোখে দেখে, আশপাশ থেকে ভেসে আসে নানান মন্তব্য| কিন্তু কোনদিনই সে এসবের ধার ধারে না| আজ সে ডেলিভারি দিতে যায় বাইপাসের ধারে এক অভিজাত আবাসনে| ক’দিন  ধরেই খুব বৃষ্টি হচ্ছে শহরে, বাইপাস কানেক্টর এর আন্ডারওয়েগুলো জলের দখলে| তারপর সকাল থেকেই শরীরটা তার ভাল ছিল না|  টানা বৃষ্টিতে ভিজে জ্বর সর্দি মত হয়ে গেছে|  সকালে বেরোনোর সময় অমৃতা একটা প্যারাসিটামল দিয়েছিল খেতে, সেটা এখনো পকেটেই রয়ে গেছে| আবাসনের সঠিক ঠিকানায় পৌঁছে দরজায় টোকা দেয় সে| অপরপ্রান্ত থেকে কর্কশ ও রুষ্ট নারী কন্ঠে উত্তর আসে, “মহারাজার এতক্ষণে আসার সময় হয়েছে”| দরজা খুলে বেরিয়ে আসে বছর 22-23 এর এক যুবতী| আর তার সাথে সাথেই শুরু হয় অসহ্য গালিগালাজ, কারণ তার নাকি পৌঁছতে মিনিট দশেক দেরি হয়েছে| অরিজিত এই অনিচ্ছাকৃত ভুলের জন্য ক্ষমা চাইলেও সেই যুবতী বন্ধ করেনি তার কুকথার আস্ফালন| তাকে হুমকি দেয়া হয় সে যদি খাবারের দাম ফেরত না দেয় তাহলে তার বাইক এবং মোবাইল আটকে রাখা হবে| তাতে সে রাজি  না হওয়ায়, ঘটে তার জীবনের সবচেয়ে অপমানজনক ঘটনা| সেই যুবতী তার দিকে ছুঁড়ে দেয় খাবার ভর্তি টিফিন বাক্সটা| রাগে, দুঃখে, অপমানে মাটিতে মিশে যেতে ইচ্ছে করে অরিজিতের| শেষ অব্দি খাবারের দাম বাবদ 475 টাকা সেই যুবতীর হাতে তুলে দিয়ে পকেটের প্যারাসিটামল গলাধঃকরণ করে কোনরকমে বাড়ি ফিরে আসে| বাড়ি এসে অরিজিত কিছু খেতে পারেনা| অমৃতার অনেক জোরাজুরিতে কোনরকমে একটা রুটি খেয়ে উঠে পড়ে শোবার ঘরে চলে যায় সে|

এই ঘটনার পর কেটে গেছে বেশ কয়েকটা বছর| অরিজিত আজ সুপ্রতিষ্ঠিত, নিজ পরিশ্রম ও কর্মগুণে আজ সে সরকারি আমলা| মা আজ আর নেই| সেইসব মুহূর্তে যখন অরিজিত পরিশ্রম করছে, নিজের সাথে লড়াই করছে, একটা সরকারি চাকরি পাবার আশায়, তখনই সে হারিয়ে ফেলে মাকে|  হৃৎপিন্ডে কোন একটা সমস্যা হয়েছিল, কাউকে কোনদিনও জানতে দেয়নি| আসলে মায়েরা মনে হয় এরকমই, হয়, সবকিছুই বুকে লুকিয়ে রাখে| অমৃতা সমান ভাবে তার পাশে থেকে গেছে ,আজও| তাই ওর সাফল্যটা সবথেকে কাছ থেকে প্রত্যক্ষ করার অধিকার একমাত্র অমৃতারই| সোহিনী সামনের বছর মাধ্যমিক দেবে| এইসব ভাবতে ভাবতে সামনের দরজায় হালকা টোকা| এক নারীকন্ঠের প্রশ্ন, “আসতে পারি স্যার?” অরিজিত আসার নির্দেশ দিলে ভদ্রমহিলা ঘরে আসেন| ভদ্রমহিলাকে দেখে এক লহমায় সবকিছু মনে পড়ে যায় অরিজিতের| বছর পাঁচেক আগে সেই রাতের স্মৃতি ভেসে ওঠে তার মানসপটে| মনে মনে সে ধন্যবাদ জানায় ওই ভদ্রমহিলার সেই অপমানের| যা তাকে চাকরি ছাড়ার সিদ্ধান্তটা নিতে ত্বরান্বিত করে, যা তার জেদ বাড়িয়ে দেয়, যা তাকে রক্ত ঘাম ঝরানোর পরিশ্রম করে সরকারী আমলা হয়ে ওঠার অনুপ্রেরণা যোগায়| এই অপমানই তাকে ইস্পাতকঠিন করে তোলে, তার পারিবারিক সম্পর্ককে মজবুতি দেয় আর সবচেয়ে বড় কথা আজ তার সাফল্য এনে দেয়| অরিজিত স্বাভাবিক নিয়মে কুশল বিনিময় করে ভদ্রমহিলাকে সামনের চেয়ারে বসতে অনুরোধ করে| ভদ্রমহিলার হয়তো ঘটনাটা মনে আছে কারণ অরিজিত  তার চোখে লক্ষ্য করে ইতস্তত লজ্জা|  আর অরিজিতের চোখে ঠোঁটে মুখে  তখন বিজয়ীর চওড়া হাসি…||

লেখক পরিচিতি:-

লেখক শ্রী প্রতীপ কুমার হাজরা 1991 সালের 1 লা অক্টোবর হাওড়া শহরে জন্মগ্রহণ করেন| তার বিদ্যালয় জীবন অতিবাহিত হয় হাওড়ার সুবিখ্যাতবিবেকানন্দ ইনস্টিটিউশনে”| লেখক প্রাণিবিদ্যা বিষয়ে স্নাতক স্নাতকোত্তর স্তরে পড়াশোনা করেন যথাক্রমে কলিকাতা বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে| তার কর্মজীবনের শুরু 2016 সালে জীববিদ্যারএকজন শিক্ষক হিসেবে| তিনি তার কর্মজীবনের প্রায় দুবছর অতিক্রম করেন ছত্রিশগড় রাজ্যের রায়পুর শহরে| লেখক বর্তমানে হাওড়া জেলার লিলুয়া চকপাড়া অঞ্চলের শ্রী সারদা দেবী গার্লস প্রাইমারি স্কুলের সহকারী শিক্ষক পদে কর্মরত|

ফ্যান্সি লেনের অন্দরে – সায়ন তালুকদার

ফ্যান্সি লেনের অন্দরে - সায়ন তালুকদার

“কলকাতা,তুমিও হেঁটে দেখ কলকাতা…”।হ্যাঁ, সত্যিই ইতিহাসের রঙে ছোপানো এই কালের শহর, ভালোবাসার শহর কল্লোলিনী কলকাতাকে যদি আপনাকে গভীরভাবে চিনতে,জানতে,বুঝতে হয় তাহলে আপনার এগারো নম্বরই একমাত্র সলিউশন।

চলুন পায়ে পায়ে হেঁটেই তিলোত্তমার বুকে ইতিহাসের গন্ধ খোঁজা শুরু করি।আজ যাওয়া যাক ‘ফ্যান্সি লেন’।

ঐতিহাসিকদের মতে,এই ‘ফ্যান্সি’ শব্দের সঙ্গে শখ বা শৌখিনতার কোনো সম্পর্ক নেই।বাংলায় এই রাস্তাকে বলা হত ফাঁসি লেন।না,আপনি শুনতে কোনো ভুল করেননি।ইংরেজরা ‘ফাঁসি’ উচ্চারণ করতে পারতেন না বলে ‘ফ্যান্সি’ বলতেন। সেই থেকেই এই রাস্তার নাম ‘ফ্যান্সি লেন’। ডালহৌসির কাছে এখন যেখানে কাউন্সিল হাউস স্ট্রিট,সাহেবি আমলে লালদিঘির প্রায় গা-ঘেঁষে ছিল সাহেবপাড়া, তার খুব কাছেই এই ফ্যান্সি লেন।একটা সময় এর পাশ দিয়ে একটা খাল বা ‘ক্রিক’ প্রবাহিত হত বলে জানা যায়। এখন অবশ্য সেটি আর নেই।

আর্চডিকন হাইড তাঁর ‘প্যারোকিয়াল অ্যানালস’ এবং ‘পেরিশ অব বেঙ্গল’ বই দুটিতে বলেছেন-“The creek took a half turn round this battery and kept Eastwards beneath three gated bridges, until the fences turned downwards from it at Fancy Lane.

”নবাবি ইতিহাস বলছে, একসময় এই পুরো জায়গাটাই ছিল জঙ্গলে ভরা।‌‌‌‌

লোকজন বিশেষ ছিল না বললেই চলে। 

থাকার মধ্যে ছিল অজস্র গাছ, বেশ কিছু চোর-ডাকাত, মাঝে মাঝে নবাবের সেপাই-সান্ত্রী আর কিছু তীর্থযাত্রী, যারা প্রাণ হাতে নিয়ে পার হত ওই এলাকা।তখনও পলাশির যুদ্ধ হয়নি, ফলে গোরা সাহেবের রাজত্বও শুরু হয়নি এ দেশে।

সেইসময় হালিশহর থেকে কালীঘাটের মন্দির পর্যন্ত বিরাট লম্বা একটা রাস্তা ছিল। সেটাই ছিল ওই তীর্থযাত্রীদের পথ। কালীভক্তদের দল ওই পথ দিয়েই মন্দিরে যাতায়াত করতেন। রাস্তাটা চৌরঙ্গির জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে গিয়ে আদিগঙ্গার পাশ ছুঁয়ে কালীঘাটে গিয়ে পড়ত। তীর্থযাত্রী ছাড়াও অনেক ছোটখাটো ব্যবসায়ীর দলও ওই পথ দিয়ে ব্যবসা করতে যেত, সঙ্গে থাকত নানা জিনিসপত্র।চৌরঙ্গির ওই জঙ্গল ছিল চোর-ডাকাতদের আস্তানা। সুযোগ পেলেই  তারা তীর্থযাত্রী বা ব্যবসায়ীদের মেরেধরে সবকিছু কেড়ে নিত। বাধা দিতে গেলে প্রাণ যাওয়াটাও বিচিত্র ছিল না। প্রচুর ডাকাতি হত বলে নবাবি কোতোয়ালি বা সেপাইদের চৌকি ছিল। কিন্তু তা সত্ত্বেও ডাকাতি বন্ধ করা যায়নি। তখন নবাবি সেপাইরা ডাকাতদের মনে ভয় ধরানোর জন্য একটা বিচিত্র রাস্তা নিল। মাঝে মাঝে হাতেনাতে ডাকাত ধরে ফেলতে পারলে, দ্রুত বিচার করে ওখানেই ফাঁসি! সরাসরি ওই রাস্তার উপরেই গলায় দড়ি বেঁধে গাছের ডালে ঝুলিয়ে দেওয়া, ব্যস! কারও কারও মতে, সেখানে একটা ফাঁসির মঞ্চ ছিল। আর্চডিকন হাইড তার বইতে দেখিয়েছেন, ফাঁসির মঞ্চটি ছিল একটি গাছের সঙ্গে সংলগ্ন। ১৮০০ সালের কথা। ব্রজকিশোর নামে এক কিশোর পঁচিশ টাকা দামের একটা ঘড়ি চুরি করেছিল।সেই অপরাধে প্রকাশ্য রাস্তায় তৈরি হল সেই ফাঁসির মঞ্চ। জনসাধারণ ভিড় করে দেখেছিল সেই ফাঁসি।সিরাজদ্দৌলার কলকাতা আক্রমণের সময়েও নাকি ‘ফ্যান্সি লেন’ ছিল। ওই রাস্তার কাছাকাছি নবাবের কামান বসানো হয়েছিল ইংরেজদের দুর্গ ফোর্ট উইলিয়াম ধ্বংস করবার জন্য।  

কত শত মানুষের ফাঁসির ইতিহাস, তাদের মৃত্যুর সাক্ষী আজও বহন করে চলেছে এই ফ্যান্সি লেন,বর্তমানে যার নাম পান্নালাল ব্যানার্জী রোড।

The Sky is Blue – Upasana Mukherjee

The Sky is Blue - Upasana Mukherjee

Blue Sky

Today is different for Sonia ,she is watching  the morning  sky filled with white clouds. Different flower are smiling in their blowing faces .The birds are chirping merrily. The squirrel  are fidgeting with their  nuts .A melodious tune coming from far and away pervades the surrounding. Everything appears so beautiful. 

On 29th  September 2020,were the darkest days of her life .In the evening, her parents  took her to the doctor. When the doctor  came with the results,  he told her to wait outside  the room with her aunty .After some time her parents  came out the room . They had tears in their eyes.

Sonia asked” Mom! Dad! What happened ?”

They didn’t  speak  a word .

At night before tucking her to bed her mom told her about  the diagnosis  of  the  doctor. 

In the morning, she, she felt  gloomy ,sad and sick . In the evening  she got shifted to a hospital  bed. She was the only one there. Her chemotherapy  started.  Slowly  her hair  fell out . She felt very unhappy. As days passed she felt more miserable.  No one  was allowed to meet her except  her , nurse , and parent . Her parent now talked to her with their heads down .cried in her absence. These things  made her very upset. Sometimes she used to look out the hospital window to see the bird and the white clouds floating the blue sky . She  silently said  to the clouds  “Oh clouds! Please tell my parents and friends  that I will  come  back “

While she was saying  this sunlight  peep through  the clouds  .

After a month ,she was allowed  to go home . For her this was a sign of progress  . But every few days she had to go back to the hospital for her chemotherapy.  It was very painful  but she withstood it courageously. 

After six months of chemotherapy and check-ups and being  trapped  in a  room, yesterday  the doctor  told her that she is finally  cured.

She left  the hospital  room and  went to the chamber of the  doctor . When her mother  thanked  the doctor in the tearful  eyes ,she could  see  the  blue sky in her mothers eyes .

I am Upasana Mukherjee, a 6 grade student in  Shrishikshayatan school,  Kolkata ,West Bengal . I am currently  12 years  old and was born  on 9th  September  2009. I love to draw  and sometimes  like to read books. My favourite  books  are -Matilda by Roald Dahl and Harry Potter  series  by J.K. Rowling.  While my favourite  writers  are  – Ruskin Bond  , Sudha Murty and Roald Dahl. 

Thanks and regards. 

Upasana Mukherjee

The Blue Lehenga – Debasish Banerjee

The Blue Lehenga - Debasish Banerjee

Mistu, a ten-year-old, pale-faced girl was staring at the illuminated show case in the Super Market. The mannequin wearing a gorgeous lehenga was the most cherished article she desired to possess. But, she knew that a dream of such height was something she could hardly access to. Despite, the little girl stuck her radiant eyes on the mannequin. Her helpless heart cried out silently,”O God! Had I the lehenga, my Durga puja would have been so wonderful!” She turned her head side ways alarmingly, slouched ahead and touched the smooth glass-box where the mannequin was giving a pose in pride and pomp clad in the lehenga. The royal blue lehenga was dazzling all over in bright stones and golden embroidery. She ran her soft, thin hand over the glass-box trying in vain to touch the dress.

 Her father Haran came near to take her home at the end of his business when darkness was setting in.  He hollered,”You, little imp! Haven’t I told you not to touch this?” He pinched the girl on her hand. She gave out a wail and her fair cheeks and nose tip turned pink. He ignored and continued,”This dress is so expensive! Look at the price-tag… two thousand rupees!” He rounded his eyes in astonishment. 

Presently, her father wrapped up his paraphernalia with a smiling face after a successful business day. He had earned ninety rupees. His business slackened with the darkness setting in this area of town mostly occupied by cloth stores, shopping malls, medical outlets and grocery kiosks. Haran dared not set up a stall in the town’s fish-market to sell such trivial like snails and crabs that his wife would collect from the nearest ponds of his village Dubchururia. Every weekend he came to this fringe of the market and spread a piece of polythene on the pavement, set his rusty, iron scales and two old aluminum tumblers containing snails and crabs and shouted his trade cry. On coming darkness people forgot him. They all thronged to the illuminated cloth stores and shopping malls. His business day ended this way. Sometimes his little daughter Mistu accompanied him. She liked the dazzling nights of the city. 

Durga puja was ensuing. As the next day would be Mahalaya, Mistu was gazing still at the endless stretch of kashful that the courtyard of the house overlooked. She was getting restless for the dress she had seen in the Super Market. It seemed as though every inch of her heart and soul suddenly grew obstinate for the day’s work and they would not be set at rest until her eyes could appease their thirst by having a glance at the dress and her hands could feel the touch of the rich, silky fabric of it. 

It was afternoon. She was alone in the hut. Her mother was away to collect snails from Ranibandh, the biggest pond of the village. His father had gone out to run errands for Bisheshwar, the rich money lender of the area. He did odd jobs for him besides selling snails and crabs to make ends meet. Lonely Mistu was looking at the white, fluffy clouds floating in the blue firmament typical of autumn. Suddenly she heard a knock at the wobbly wooden door. Surprised at this she scuttled and opened the door with a creak on their hinges. 

On opening the door her dreamy eyes found a girl almost of her age standing before her. A fair complexioned, bright eyed country girl with dark, curly hair cascading down her shoulders, wearing a saree with red border nearly choked the young beholder to surprise. 

“Who’re you?” asked Mistu suspense in eyes.

“I’m Uma,” answered the little girl, “can I have some thing to eat? I haven’t eaten anything since yesterday.”

“Where’re your parents? Why’re they not with you?” questions gushed out.

“I’ve lost them in flood. I’m driven away from my maternal house,” replied the girl with tears to the brink of her eyes. 

“Where’re you going this way?

“My aunt lives there,” the girl stretched out her hand towards something vague, filmy lines of palm trees far away, “in that village.”

“Come inside.”

Before long the native girl was served with a sumptuous meal of puffed rice, milk and jaggery.  She ate her fill.

She expressed her gratitude for giving her a generous meal. 

“Can’t you stay here for the rest of the day?” Mistu requested. 

“No,no,” answered the girl promptly, “I’ve to reach there by the evening. They’re are getting worried of me for tomorrow’s Mahalaya. I’ll put on a new dress and observe a fast to worship Maa Durga to bring my parents back to me.” Then she paused briefly and looking straight at her little hostess’ eyes asked, “Won’t you wear new dress? How many have you bought for the puja?”

“I’ve none,” replied Mistu. “My father’ll buy me a tunic later on Saptami when he’ll have laid by three hundred rupees. Then we’ll have something to wear for the festival.” Then all at once, her eyes turned dreamy and she gave vent to her feelings suppressed within the deep down of her heart,” But I don’t feel like wearing the tunic father’ll give me. I like the dress in Super Market…”

“What do you mean?” asked little departing guest.

“I want to have the blue lehenga I saw in the Super Market the previous day…”

“and you’ll have it,” uttered Uma promptly cutting her off showering a cascade of smile. “You’ll have your dream.”

And she departed, soon vanished beyond the vague lines of the palm trees. 

Mistu remained dumbstruck looking ahead where a flock of herons were flapping their wings to perch on the palm tree tops. She knew that she could not believe in the words of her departing guest for it was so unlikely for her. But, she hoped against hope.

That late afternoon when her mother returned Mistu told everything happened to her.  She only brushed aside the little girl’s words smilingly  saying that she mustn’t harbour on whatever is unreal. 

Her mother’s such words were easy enough to collapse the dream she was building brick by brick. In a corner of pillow she thought of Madhu, Rekha, Asha and Jayanti who would definitely show themselves off in their splendid attires. “How excruciating it would be! Saptami, Ashtami, Navami and Dashami will remain dull,” such apprehension arrested her innocent, delicate heart.

Time rolled on. A bit of Moon appeared behind the drumstick tree on the courtyard. The shrill notes of cicadas and crickets entirely occupied the hushed silence of the night. Presently, Mistu heard an usual, faint metallic knock at the door. 

Her mother opened the gate and lo! 

What was she beholding?

Mistu scuttled up to where his father was and with her little curious eyes saw his father holding a packet under his arm wrapped in bright, crispy oil paper. 

“What’s it?” asked she unable to suppress her inquisitiveness still beholding the glittering packet that tempted the girl with its crispy notes.

“Where did you get this from?” her mother enquired. “What’s in it?”

Haran who was listening to them entered the room, sat down cross-legged at the threshold and narrated the entire incident, “My master Bisheshwar had been to the city this morning on an important business. On his way back he had purchased a dress from Super Market for her daughter Pinky.”

They, all were silent and Mistu was blinking in amazement. 

Her father continued,” But how unfortunate Pinky was , as the dress didn’t fit her and she couldn’t wear it. She’s twelve and is growing fast. She’s in tears. My master handed it over to me for my Mistu…”

“Why didn’t he exchange the dress the next day with a better one ? You shouldn’t have taken it,” reprimanded his wife with a scowl.

Haran continued, “I refused to take such an expensive dress but you know he’s a good man, just tucked the packet in my hand saying that I should take this dress as a gift for saving his daughter Pinky from drowning into the Ranibandh six months ago. Master said that he owed me this favour.”

Mistu after a restless wait unwrapped the packet with her thin, cheerful fingers. Just in a few seconds she witnessed a great moment she had ever expected. Her mother took the dress out of the packet and unfurled it presently. Eyes goggled, lower jaw hung Mistu could not believe the spectacle before her eyes—the same lehenga in royal blue, dazzling in bright stones and golden embroidery she passionately dreamed to possess that she had seen in the SuperMarket. She felt as though she got the entire wealth of the world. The four digit price-tag was still peeping out—2000/- .

Her father shot up his brows. 

Mistu thought of Uma.

Author’s Bio: –

Debasish Banerjee, besides being a teacher of English (M.A Eng. Bed.), is a passionate writer. Published
in some prestigious journal like Contemporary Literary Review India, YAWP journal and Kitaab
International (Singapore) his stories mesmerize the readers for their bizarre plots. Some of his short
stories have also appeared in some Bengali online journal Samantaral Sahitya Patrika and Barnik Sahitya.
He has been awarded INDIA AUTHORS PRIME AWARD 2021 for his book Quest For A Broken
Cage(2018). His book Telling Your Stories Only, a collection of short stories has been recently published
as an e-book.