fbpx

লিঙ্গবৈষম্য ও সার্বজনীন দুর্গোৎসব – সুরভি ঝা

লিঙ্গবৈষম্য ও সার্বজনীন দুর্গোৎসব - সুরভি ঝা

পূজো আমার, পূজো তোমার, পূজো সবার। কারণ দুর্গাপূজো বাঙালির শ্রেষ্ঠ পূজো। একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে যে প্রশ্ন মাথায় আসে তা হলো সত্যিই কি পূজোর বেদী সবাই কে সমানভাবেই আহ্বান জানায়? বেদীর উপর রাজ করতে দেখা যায় পুরোহিত মশাইদের। তারপর যাদের পূজো তাদের আভিজাত্য ঝলমল করে। পুরুষ লিঙ্গ আয়োজন করে, স্ত্রী- লিঙ্গ জোগাড় করার সাথে সাথে আবার দশভূজা হয়ে বাকিটুকুও সামলে নেয়। মা দূর্গার দশভূজা হ‌ওয়ার ক্ষমতাকে যেইভাবে আমরা মহিমান্বিত করি, মহিলাদের এই সমস্ত কাজ সামলানোর প্রথাকেও আমরা এক‌ইভাবে বাহবা দিয়ে থাকি। এরপরে আসে আর এক লিঙ্গের পূজো, রুপান্তরকামীদের পূজো। তারা বেদীর ঠিক কোন জায়গায় থাকে? আরতি হাতে নিয়ে থাকে? না ঘন্টা বাজায়? না মালা গাঁথে? জানা নেই।কোলকাতায় রঞ্জিতা সিনহা নিজ বাসভবনে অর্ধনারীশ্বর মূর্তি পূজা করে। কারণ সেটি রূপান্তরকামী সত্ত্বার প্রতিফলন। মানসিক ভাবে তারা স্ত্রীসুলভ, শারীরিকভাবে তারা পুরুষালী। মূর্তি গড়ে তারা নিজেরাই, কুমোরটুলির শিল্পীদের আদোলে। নিজেদেরই আয়োজনে, ও ফান্ডে অনুষ্ঠিত হয় তাদের পূজো। নারীর শরীর তার নারীত্বের জন্য শিকার পুরুষালী চাহিদার কাছে। এই দুই লিঙ্গের এক দেহে বিচরণ সেই দেহটিকে ঘাবড়ে দেয় সবথেকে বেশি। কিন্তু মনুষ্যোচিত বৈশিষ্ট্য থেকে ভ্রষ্ট(ডিহিউম্যানাইজ)করে না কোন ভাবেই। তা না জানায় অথবা জানার বিষয়ের মধ্যেই না রাখার কারণে পুরুষ ও স্ত্রী লিঙ্গের পরের জায়গাটা ফর্মে “আদার” হিসেবে পেলেও পূজো মণ্ডপে দেখা যায় না তাদের। মেয়ের সাজে এসেও পুরুষের আওয়াজ এলিয়েন-সম গড়ে তোলে তাদের। বন্ধু বান্ধবীর দলে স্থান হয় না তাদের।মায়ের মূর্তিকে কুমোরটুলি বানায় নারীর যথাযথ শারীরিক মাপ ও পুরুষালি দৃকপাত অনুযায়ী। মা দূর্গার নারীশক্তির প্রতীক তখনই হয়ে ওঠে যখন তার রোষে অরাজকতার মৃত্যু হয়। যখন পুরুষের অন্ডকোষে তৃপ্তি জাগানো নারীটিকে সে বশ করতে পারে না চিরাচরিত রীতি অনুসারে। যাকে বশ করা যায় না, তাকে সমাজ বরণ করে না। দূর্গাবরণ তখন হয় যখন সে সম্পূর্ণ মাটির প্রতিমা- ধীর ও শান্ত। ইংরেজিতে রুপান্তরকামীদের আমরা ‘ট্রান্সজেন্ডার’ বলে থাকি। ‘ট্রান্স’ অর্থাৎ ‘বিয়ন্ড’, অর্থাৎ অতিক্রম করে। ‘জেন্ডার’ বলতে বোঝায় সেই শরীরটিকে যাকে সমাজ তার মতোন করে গঠন করতে চায়, জীবতাত্ত্বিক পার্থক্যের বাইরে গিয়ে। ‘ট্রান্সজেন্ডার’ কথাটির মানে তাই সামাজিক বাঁধনের উর্ধ্বে গিয়ে জুডিথ বাটলারের ‘পারফরম্যান্স’ এর ভিত্তিতে গড়ে ওঠে যেই লিঙ্গ। সাইমন দি বিউভয়ার এর মতানুযায়ী নারীর অবস্থান সমাজে ‘আগন্তুক’ এর মতন। সভ্যতা পুরুষোচিত। এই সমাজে ট্রান্সজেন্ডারের অবস্থান সুতরাং আরও প্রান্তিক। যার পূজোর মণ্ডপে স্বাধীনভাবে ঘুরে বেড়ানোর অধিকার নেই। পূজোর এই সার্বজনীনতা নিয়ে তাই প্রশ্ন ওঠে বারংবার!  পূজোর আনন্দ কী প্রকৃতই সবার সামর্থ্যৈর মধ্যে পড়ে? লিঙ্গের পরিচয় দুর্গা পূজোর উদযাপনকে নির্ধারণ করে যেখানে, সেখানে মা দূর্গার সার্বজনীনতা প্রশ্নাতীত কখোনো হতে পারে না। সুতরাং দুর্গোৎসব সার্বজনীন করার দায়িত্ব কিন্তু আমাদের সকলের। শত্রুতা থাক কোভিডের সাথে, নির্দিষ্ট লিঙ্গের সাথে নয়। যাতে সত্যিই পুজো সবার হতে পারে এই চেষ্টা আমাদের থাকুক।

লেখিকার পরিচয়:

সুরভি ঝা বর্তমানে রায়গঞ্জ বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক। তার নিজস্ব সংস্থার মাধ্যমে বিভিন্ন সামাজিক কাজের সঙ্গে জড়িত।