fbpx

ইতিহাস, সাম্প্রদায়িকতা ও ব্রাহ্মণ্যতন্ত্র- নির্মলেন্দু কুণ্ডু

ইতিহাস, সাম্প্রদায়িকতা ও ব্রাহ্মণ্যতন্ত্র- নির্মলেন্দু কুণ্ডু

ভারতবর্ষের ইতিহাসের আলোচনা করতে বসলে ধর্মকে বাদ দেওয়া অসম্ভব ৷ ইতিহাসের যুগবিভাজন করতে বসলে যে প্রাচীন যুগের কথা আমরা পাই, সে সম্পর্কে জানার অন্যতম মূল উপাদান হল বৈদিক সাহিত্য, বিভিন্ন বৌদ্ধ ও জৈন গ্রন্থ ৷ এর পাশাপাশি রামায়ণ-মহাভারতের মতো কাব্যগ্রন্থ তথা ধর্মপুস্তকও অনেক ঐতিহাসিকের দৃষ্টিতে হয়ে পড়ে আকর ৷ সুতরাং ধর্মহীন প্রাচীন ভারত কল্পনাতীত ৷ আর সেই পরিপ্রেক্ষিতেই ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গী ভারত-ইতিহাস বর্ণনায় অন্যতম ভূমিকা নিয়ে থাকে ৷

আমরা প্রায়শই দেখে থাকি, প্রাচীন ঐতিহ্যের কথা বলতে গেলে আমরা সেই বেদকেন্দ্রিক ও ধর্মবহুল ইতিহাসের আলোচনাই শুরু করি ৷ যা  হিন্দু ধর্মকে মহিমান্বিত করে ৷ অপরদিকে মধ্যযুগের আলোচনা করতে বসলেই অবশ্যম্ভাবী হয়ে পড়ে মুসলিমদের এদেশে আগমন এবং হিন্দুদের সাথে তাদের বিরোধের ব্যাখ্যা-বিবরণ ৷ আর ঠিক এখানটাতেই আলোচনা শুরু করেছেন প্রাবন্ধিক পুলক চন্দ ৷ 
বর্ধমানের শ্যামসুন্দর কলেজের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক পুলকবাবু বাংলা সাহিত্য-সংস্কৃতি-ইতিহাসের বিবিধ বিষয়ে গবেষণামূলক গ্রন্থ লিখেছেন ৷ এর মধ্যে আমাদের আলোচ্য প্রবন্ধগ্রন্থটি ছাড়াও “ভিন্নপাঠে বন্দেমাতরম ও একটি দুষ্প্রাপ্য কাব্যগ্রন্থ”, “ব্রিটিশ ভারতে শিক্ষাষড়যন্ত্র” ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ ৷

বর্তমান ধর্মীয় পরিমন্ডলে দাঁড়িয়ে ধর্মীয় মৌলবাদের বিরুদ্ধে যুক্তিগ্রাহ্য ব্যাখ্যা প্রদানের উদ্দেশ্যেই এই গ্রন্থের অবতারণা ৷ প্রাবন্ধিক দেখিয়েছেন কীভাবে কিছু ‘সাম্প্রদায়িক’ ‘পক্ষপাতদুষ্ট’ ঐতিহাসিক ভারতের ইতিহাসে হিন্দু-মুসলিম বিরোধের কথা তুলে এক খন্ডিত ইতিহাস আমাদের সামনে তুলে ধরেছেন ৷ আর সেই খন্ডিত ইতিহাসকে আরও বিকৃত করছে কিছু উগ্র ধর্মান্ধ মানুষ তাদের সংকীর্ণ স্বার্থসিদ্ধির উদ্দেশ্যে ৷ তিনি কিছু উদাহরণ দিয়ে দেখিয়েছেন, মধ্যযুগে হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে সাধারণ মানুষের ওপর শোষণ ও অত্যাচার নেমে এসেছিল ও তা করেছিল হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে ভূম্যধিকারীরা ৷ আবার অ-মুসলিমদের কাছ থেকে প্রাপ্ত জিজিয়া কর চাপানোর উদ্দেশ্য ছিল রাজনৈতিক ৷ ধর্মান্তরন কোন ইসলাম ধর্মাবলম্বী শাসকের মূল কাজ ছিল না, বরং দলে দলে হিন্দুরা ‘সামাজিক সাম্য’ ও ‘উচ্চপদ পাওয়ার লোভে’ ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন ৷ কারন সুদীর্ঘকাল ধরে চলে আসা ব্রাহ্মণ্যশ্রেণীর সামাজিক-আর্থিক নিষ্পেশনে তারা দলিত হচ্ছিল ৷ প্রাবন্ধিক আরও দেখিয়েছেন, সমাজপতি ব্রাহ্মণ-উলেমাদের সাথে রাজ্যপতি রাজা-সুলতানদের সম্পর্ক কখনো ছিল এক সুতোয় গাঁথা, কখনো দ্বন্দ্বময় ৷ এবং অবশ্যই তা পারস্পরিক স্বার্থকেন্দ্রিক ৷

গ্রন্থের দ্বিতীয় রচনাটি অধ্যাপক অশোক রুদ্রের ‘ব্রাহ্মণ্য ভাবধারা ও আধুনিক হিন্দু মন’ গ্রন্থের সমালোচনা হিসেবে লেখা হলেও আলোচনার গুণে স্বতন্ত্র রচনা হিসেবে গ্রহণীয় ৷ এখানেও তিনি অধ্যাপক রুদ্রের বক্তব্যের বিরোধিতা করতে উপাদান হিসেবে বেছে নিয়েছেন বিভিন্ন ধর্মীয় ও তৎকেন্দ্রিক গ্রন্থাবলিকে ৷

ইতিহাসমাত্রই বহুকৌণিক ৷ একটা নির্দিষ্ট দৃষ্টিকোণ ইতিহাসে না থাকাটাই বাঞ্ছনীয় ৷ আর বর্তমান সময়ে দাঁড়িয়ে ব্রাহ্মণ্যতন্ত্র, মৌলবাদ, হিন্দু-মুসলিম সম্পর্কের মতো বিতর্কিত বিষয়ের ওপর এমন দৃষ্টিভঙ্গীর পরিচায়ক রচনা পাঠ সময়োপযোগী ও প্রাসঙ্গিক ৷ পাঠক হিসেবে আমাদের মনের ব্যাপ্তি ঘটাতে সাহায্য করবে গ্রন্থটি ৷ কিছু অবাঞ্ছিত বানান ভুল ও সামান্য গুরুগম্ভীর প্রেজেন্টেশন বাদ দিলে গ্রন্থটি যথেষ্ট উপভোগ্য ৷

লেখক পরিচিতি —
নির্মলেন্দু কুণ্ডু পেশায় শিক্ষক হলেও লেখালেখির শুরু সেই ছোট থেকেই ৷ ছোটবেলায় সূর্যসেনা পত্রিকায় লেখা প্রকাশ দিয়ে শুরু, তারপর পরবর্তী জীবনে এ রাজ্য ও ভিন রাজ্যের কিছু পত্রপত্রিকায় লেখা ছাপা হয় ৷ একটি কিশোর উপযোগী গল্প ছাপা হয়েছে আনন্দমেলা পত্রিকাতেও ৷ গল্পের পাশাপাশি কবিতা, প্রবন্ধ ইত্যাদি চর্চার সাথেও যুক্ত ৷ বর্তমানে আমাদের পদক্ষেপ পত্রিকার সম্পাদনার কাজে যুক্ত ৷ শুরু হয়েছে আমাদের পদক্ষেপ প্রকাশনীর কাজও ৷ ইতিমধ্যে ‘এক টুকরো আয়না’, ‘অণুগল্প ১০০’ নামক দুটি সংকলনগ্রন্থে গল্প ও ‘কবিতা স্টেশন’ গ্রন্থে কবিতা প্রকাশিত হওয়ার পাশাপাশি প্রকাশিত হয়েছে একক কবিতার বই ‘রোমন্থন’ ও একক গল্পের বই (পিডিএফ আকারে) ‘১৬ আনা’ ৷