fbpx

মেকআপ

মেকআপ - ভবানী কৃষ্ণা দাস

সাত তলার ওপরে  ডান দিকের ফ্ল্যাটে রাত আটটায় ধূপ করে আলো জ্বলে উঠলো। ব্যাঙ্কে কর্মরতা অনসূয়া সারাদিন অফিস করে বাড়িতে ফিরলো। স্বামী সৌমেন্দ্র মাল্টি ন্যাশানাল কোম্পানির বিশেষ পদে নিযুক্ত। এত বড়ো ফ্ল্যাটে কেবল এই দুটি মানুষের বসবাস। এইসব ছাড়াও তার আর এক অন্যতম পরিচয় তাকে কখনও কেউ বিনা মেকআপ ছাড়া দেখেনি। পরিচিত লোকজন, অফিস কলিগ সবাই বেশ বলে মেকআপ কুইন। সবসময় বেশ চড়া মেকআপ থাকে তার মুখে। লোকের কথায় অনসূয়া বেশ মিষ্টি হেসে বেরিয়ে যায়। 
 
    বাড়িতে ঢুকে অনসূয়া ব্যাগটা সোফায় ফেলে এগিয়ে গেল ওয়াশরুমের দিকে। কিছুক্ষণের জলের ছিটেয় সারাদিনের চড়া মেকআপ ধূয়ে যেতে লাগলো। তারপর বেরিয়ে আসা মুখশ্রী যা অনসূয়া নিজে দেখে ভয়ে আতকে ওঠে। চোখের তলায় অজস্র কালি জমাট বেঁধেছে, তার ওপর পুরুষালি শক্ত হাতের থাবার দাক। সারা মুখশ্রী জুড়ে অনেকগুলো কাটার দাগ। কোথাও আবার জমাট বেঁধেছে রক্ত। চুলে ঢাকা ঘাড়ে রক্ত জমাট বেঁধে চলেছে দিনের পর দিন। জামাকাপড় পরিবর্তনের সময় তার চোখে পড়ে সারা শরীর জুড়ে অজস্র বেল্টের দেওয়া ক্ষত। কোনোটা পুরাতন আর কোনোটা গতকালের জলজ্যান্ত ক্ষত। 
 
 নিজেকে দেখেই সে মাঝে মাঝে হারিয়ে যায়। কোথায় গেল সেই আগের স্বাধীন অনসূয়ার গল্প। আজ কেবল সে বন্দী।বিবাহ নামক বন্ধনে আজ সে  জর্জরিত উপেক্ষিত অত্যাচারিত আর এসব মানিয়ে নেওয়াই নাকি তার প্রধান ধর্ম। প্রতিনিয়ত তাকে অত্যাচার মুখবন্ধ করে সহ্য করে যেতে হয়। একবার ভেবেছিল সে এই সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে যাবে। ডিভর্স দেবে সৌমেন্দ্র কে কিন্তু পারেনি। ডিভর্সে কথা শোনা মাত্র তার বাবা অশোক বাবু সহ্য করে পারেন নি। সাথে সাথে স্টোক হয়ে আশঙ্কাজনক পর্যায়ে চলে যান। অনেক কষ্টে ওনাকে সুস্থ করে বাড়ি ফিরিয়ে আনা হয়। আর তারপর থেকে চলে আসছে মানিয়ে নেওয়া। 
 
হঠাৎ করে দরজার বেলটা বেজে উঠলো। অনসূয়া ইচ্ছার বিরুদ্ধে এগিয়ে যেতে হলো দরজার দিকে। দরজা খোলা মাত্র ভেসে এলো গা গুলিয়ে ওঠা মদের গন্ধ। কিছুক্ষণ সবকিছু শান্ত, তারপর মাঝ রাত পর্যন্ত ঘরের কোণায় কোণায় ভেসে বেড়ালো অনসূয়ার বেদনাদায়ক কান্না আর মানুষরূপী জানোয়ারের নোংরা গালাগাল আর অজস্র হিংস্র অত্যাচার। 
 
 পরের দিন সকালে তাড়াতাড়ি চড়া মেকআপ লাগিয়ে নিল অনসূয়া তৈরী করে নিল নিজেকে একদম হাসিখুশি এবং সুখী মানুষ।আর ওদিকে সৌমেন্দ্র ফরমাল ড্রেসে একদম সমাজের ভদ্র, সভ্য মানুষ। একজন মানুষরূপী জানোয়ার মুখোশের আড়ালে সমাজের ভদ্রলোক। আর একজন দামি মেকাপের আড়ালে সমাজের অত্যাচারিত নারী।।