fbpx

কোন ভাঙনের পথে এলে – পায়েল বিশ্বাস

কোন ভাঙনের পথে এলে - পায়েল বিশ্বাস

আমাদের দেশ ভারতবর্ষ ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট স্বাধীনতা লাভ করে। কিন্তু ব্রিটিশ শক্তির হাত থেকে ভারতবর্ষের এই অর্জিত স্বাধীনতা প্রাপ্তির সঙ্গে জড়িয়ে আছে রক্তাক্ত, কালিমালিপ্ত ইতিহাস— সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ও দেশভাগ। দেশভাগ ভারতবর্ষের কিছু রাজনৈতিক নেতার ক্ষমতালিপ্সার অবশ্যম্ভাবী ফল। দেশভাগের কারণ নিয়ে যত মতভেদই থাক না কেন, দেশভাগের ভয়ংকর পরিণাম নিয়ে কারো মনে সংশয়মাত্র নেই। দেশভাগ নির্মমভাবে আমাদের জাতিসত্তাকে খন্ডিত করেছে স্বাধীনতা প্রাপ্তির সাথে।১৯৪৭-এর ১৪ আগস্টের মধ্যরাতে অবসান ঘটেছে ১৯০ বছরের এক অপশাসনের। ভারতবর্ষ লাভ করেছে তার কাঙ্ক্ষিত স্বাধীনতা। কিন্তু এ কোন স্বাধীনতা, কাদের স্বাধীনতা? অনেক মৃত্যু-মিছিল বেরিয়ে আমরা পৌঁছোয় এক খন্ডিত দেশের রক্তাক্ত ভূখণ্ডে। স্বাধীনতার প্রাক্কালে তৈরি হয় হিন্দু-মুসলমানের ভেতর পারস্পরিক সন্দেহ, অবিশ্বাস, হানাহানি একে অন্যকে নিঃশেষ করে দেবার নিষ্ঠূর মানসিকতা। স্বাধীনতা জন্ম দেয় দুই স্বতন্ত্র ভূখণ্ডের— হিন্দুস্তান আর পাকিস্তান। ধর্মের ভিত্তিতে দেশ ভাগ করে দুই নিকটবর্তী সম্প্রদায়ের মধ্যে বিভেদের প্রাচীর তুলে দেওয়া হয় রাতারাতি। দু-দেশেই রয়ে গেল লক্ষ লক্ষ সংখ্যালঘু মানুষ– ভারতবর্ষে মুসলমান সম্প্রদায় এবং পাকিস্তানে হিন্দু সম্প্রদায়। দেশত্যাগের প্রয়োজন অনুভব করল দু-পারের সংখ্যালঘু মানুষরা।
       ভারতবর্ষের স্বাধীনতায় দেশ বিভাজনের বিচ্ছিন্নতা হাজার হাজার মানুষের জীবন ভস্মীভূত করে দিয়েছিল। দ্বিজাতিতত্ত্বের সংকট ধনধান্যে পুষ্পে ভরা আমাদের এই বসুন্ধরা বা মিলনতীর্থ ভারতভূমিতে কুটিল রাজনৈতিক স্বার্থের লোভ লালসা বিস্তার করে। বিষাক্ত রাজনীতির আবহাওয়ায় ক্ষুদ্র বাসভূমির জন্মভূমির মায়া ত্যাগ করে বেরিয়ে পড়তে হয় অজানার উদ্দেশ্যে। এতদিন তারা পরাধীন থাকলেও আজ বিশ্বভুবনের স্বাধীনতা লাভ করে। রবীন্দ্রনাথের কথায়—-“মনে ভাবিলাম মোরে ভগবান রাখিবে না মোহগর্তেতাই লিখি দিল বিশ্বনিখিল দু বিঘার পরিবর্তে।”   নিরাশ্রয়, নিরন্ন, ছিন্নমূল মানব গোষ্ঠীর মধ্যে যারা কিছুটা অর্থ বলে বলিয়ান তাদের কাছে দেশ ত্যাগের দুঃখের মধ্যে তীর্থভ্রমণ, দেশ পর্যটন ইত্যাদির প্রলেপ থাকলেও সাধারণ মানুষের কাছে নিশ্চিতভাবে শ্মশান যাত্রা।অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্তের ‘উদ্বাস্তু’ কবিতায় ফুটে উঠেছে তারই প্রতিচ্ছবি —-“আমরা সবাই উদ্বাস্তু—কেউ উৎখাত ভিটে মাটি থেকে কেউ উৎখাত আদর্শ থেকে।”
        দেশত্যাগী উদ্বাস্তু মানুষের নিয়তি পর্যালোচনা করতে গেলে তাদের শিকড়-ছেঁড়ার বেদনা বারবার সামনে চলে আসে, এটাই তাদের জীবনের সবচেয়ে চূড়ান্ত বেদনা। শিকড় তার শাখা-প্রশাখা নিয়ে মাটির মধ্যে গভীর ভাবে গাছটাকে বাঁধে। বদ্ধমূল মানুষ নিজের মাটি, ঘর-গৃহস্থালী, প্রতিবেশী পরিচিত দিগন্ত-আকাশ ছাড়তে চায় না। দেশভাগ হল, কিন্তু দেশত্যাগ করতে চায়নি বহু মানুষ। শান্তিতে সমঝোতায় দেশটা ভাগ হতো, তাহলে ভারতবর্ষকে খন্ডিত করে দুটো নতুন রাষ্ট্র তৈরি হতো বটে, কিন্তু হিংসা-রক্তপাত হতো না, মানুষ ছিন্নমূল হতো না।
       উদ্বাস্তু মানুষজনের নিজের সমস্যা বলতে, সবচেয়ে মাথা তোলা চেহারা হলো পুনর্বাসন না পাওয়া; কিংবা পেলেও নতুন দেশ-মাটিতে শিকড় চারিয়ে দিতে না পারা। প্রতিকূল প্রাকৃতিক পরিবেশ কিংবা অনভ্যস্ত জীবনযাত্রার সমস্যা ছিন্নমূল মানুষকে মনে-প্রানে দীর্ণ করেছে।কবি মনীন্দ্র রায় তার ‘চিঠি’ কবিতায় এক উদ্বাস্তু বৃদ্ধার ছেড়ে আসা গ্রাম এবং সেখানকার মানুষদের জন্য দুশ্চিন্তা ও মন খারাপের অনুভূতি তুলে ধরেছেন:”সুশান্ত তোমার মনে পড়ে  সরলার মাকে, যে এখানে কাজ করতো? হঠাৎ সেদিন  শুনল যেই বন্যা পাকিস্তানে, বুড়ি গিয়ে বসলো বারান্দায়, দেখি তার চোখে জল ঝরে।…..”
      মানবজীবনে বাস্তুভূমির গুরুত্ব অপরিসীম। মানুষ সব হারালেও বাস্তু হারাতে চায় না। কিন্তু দেশবিভাগের ফলে সেই বাস্তুভূমি হারাতে হল মানুষকে। নিজেদের ভিটেমাটি ছেড়ে ছিন্নমূল মানুষগুলো দলে দলে সীমান্ত পেরিয়ে ট্রেনে চেপে শিয়ালদহ স্টেশনে নামতে লাগল। কিন্তু মাথা গোঁজার কোন ঠাঁই না থাকায় সেই প্লাটফর্মেই পড়ে থাকল সেই বাস্তুহারা মানুষগুলো। না আছে তাদের কাছে খাবার, না আছে পরনের কাপড়  ফুটপাতের ধারে পড়ে পড়ে ধুঁকছে মৃতপ্রায় মানুষগুলি। প্ল্যাটফর্ম থেকে তাদের তুলে নিয়ে যাওয়া হয় ক্যাম্পে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় মিত্রপক্ষের সৈনিকদের জন্য যেসব সেনা শিবির তৈরি হয়েছিল, সেসব ছাউনিকে ব্যবহার করা হয় উদ্বাস্তুদের ক্যাম্প হিসেবে। সুরেন্দ্রনাথ সরকারের একটি গানে উদ্বাস্তুদের ক্যাম্প-কলোনী মাঠে-ঘাটে বাসের মর্মন্তুদ দুঃখ এবং তার জন্য দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে তীব্র অভিযোগ ফুটিয়ে তুলেছেন— “এমন সোনার বাংলাদেশে,  মানুষ বেড়ায় ভেসে-ভেসে,  হলাম বাস্তুহারা সর্বহারা—  কার কলমের খোঁচায়।  আমরা ক্যাম্পে শুয়ে আজো মাঠে,  আর কতদিন জীবন কাটে,  দেখে মোদের দুঃখ কষ্ট—  শেয়াল কুকুর লজ্জা পায়।”
         দেশ বিভাগের ফলে সবচেয়ে বড় আঘাত নেমে এসেছিল মেয়েদের ওপর। ভিটেমাটি থেকে উৎখাত হবার যন্ত্রণাবোধ, মানসিক ভারকেন্দ্র থেকে বিচ্যুতি সবথেকে বেশী সইতে হয়েছে মেয়েদের। আমরা মানতে না চাইলেও জানি ঘরটা পুরুষদের চেয়ে অনেক বেশি মেয়েদের। তাই ভিটেমাটি ত্যাগ করার যন্ত্রণাটা মেয়েদেরকেই বেশী কষ্ট দিয়েছে। দাঙ্গা ও দেশবিভাগ পরবর্তী দুর্দশাগ্রস্ত জীবনে ছিন্নমূল মানুষের সাধারণ দুঃখ-দুর্দশা সঙ্গে মেয়েদের প্রায়ই সইতে হয়েছে অতিরিক্ত অসম্মান ও অবমাননা। শারীরিক ও মানসিকভাবে নারীত্বের ওপর যতভাবে আঘাত নেমে এসেছিল তার তীব্রতা ছিল ভয়াবহ। নারীহরণ, ধর্ষণ, সীমান্তে তল্লাশির নামে নারীত্বের অবমাননা সেদিন যতভাবে ঘটেছিল, তার সামান্য ছবিই সংবাদপত্রের প্রতিবেদনে উঠে এসেছিল, বরং বাংলা আখ্যানে তার সীমাহীন বিস্তার লক্ষ করা যায়। স্টেশন-প্লাটফর্মের ঘেয়ো জীবন থেকে ক্যাম্পের নারকীয় জীবন, সেখান থেকে কলোনির বেআব্রু অসহায় জীবন– ঠেকতে ঠেকতে, ধুঁকতে ধুঁকতে শেষ হয়ে গেছে জীবনের সব স্বপ্ন-সাধ।
        এই সমস্ত সহায়-সম্বলহীন উদ্বাস্তু মানুষগুলোর কথা মনে পড়লেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে শঙ্খ ঘোষের ‘দেশহীন’ কবিতার সেই লাইনগুলি—“আমার মুখে অন্তহীন আত্মলাঞ্ছনার ক্ষত   আমার বুকে পালানোর পালানোর আরো পালানোর দেশজোড়া স্মৃতি……”

লেখক পরিচিতি:
পায়েল বিশ্বাস ১৯৯৬ সালের ৩ এপ্রিল পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার অন্তর্গত ঘাটাল মহকুমার গোপীনাথপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। পিতার নাম অশোক বিশ্বাস এবং মাতার নাম আল্পনা বিশ্বাস। তিনি ২০১৮ সালে বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ‘বাংলা ভাষা ও সাহিত্য’ নিয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। ছোটবেলা থেকেই সাহিত্যের প্রতি ছিলো তাঁর অগাধ ভালোবাসা। তখন থেকেই গল্প,কবিতা লেখার প্রতি ছিল প্রবল ঝোঁক। বর্তমানে তিনি বিভিন্ন পত্র-পত্রিকাতে লেখালেখি করেন। ‘সমকাল সাহিত্য পত্রিকা’, ‘মুক্তি আন্তর্জাতিক পত্রিকা’, ‘সুচিন্তন সাহিত্য পত্রিকা’, ‘দীপান্বিতা সংকলন’ প্রভৃতি পত্রিকাতে তার লেখনী স্থান পেয়েছে।