Posted on Leave a comment

Sadhus And Their Enigmatic Life In Kumbh Mela

Sadhus and Their Enigmatic Life in Kumbh Mela - Joydeep Goswami

kumbh sadhus 01
যদি মেলা শব্দটির অন্তর্রনিহিত অর্থ মিলনের প্রাঙ্গন হয় যদি সংস্কৃতির মেলবন্ধনের অনুরূপক হয়, তাহলে বলাই চলে কুম্ভমেলা বিভিধতা ও  বৈচিত্রকরণের এক অদ্ভুত মিলনক্ষেত্র। সংসার, ধর্ম আর আআধ্যাত্মিকতার মিলনের পুর্ন রূপ বারে বারে দৃষ্টিগোচর হয়েছে এলাহাবাদের এই পুর্ণভূমিতে। এই পুণ্যভূমির মাহাত্ম্য কীর্তন প্রসঙ্গে বলতে গেলে বলা যায় এর মহিমা আমরা  পুরাণ এবং নানান শাস্ত্রে এর উল্লেখ আছে।
কুম্ভ মেলার সূচনাকাল কারন সম্পর্কে ঐতিহাসিক গ্রন্থ গুলিতে বিবরণ আছে যে অষ্টম খ্রীস্টাব্দে প্রাচীন ভারতের বিখ্যাত দার্শনিক, ঋষি আদি শংকরাচার্য এই মেলার সূচনা করেছিলেন হিন্দু ধর্ম কে রক্ষা করার জন্য। প্রাচীন গ্রন্থ অনুস্মৃতিতে এর উল্লেখ আছে। আরেক গ্রন্থ মেঘ মালাতে উল্লেখ আছে যে প্রতি ৬ থেকে ১২ বছর অন্তর একটি মেলা আয়োজিত হতো, তাতে পুণ্যস্নানের বর্ননা কুম্ভমেলার পুণ্যস্নানের অনুরূপ। 
ভারতের চার পবিত্র নদী তীরবর্তী অঞ্চলে এই পবিত্র মেলা আয়োজিত হয়। গঙ্গা, যমুনা এবং সরস্বতী নদীর সঙ্গম এলাহাবাদে। গঅঙ্গানদীর তীর হরিদ্বারে। গোদাবরী নদীর তীরে নাসিকে এবং শীপ্রা নদীর তীরে উজ্জয়িনীতে। এই চারটি নদীগাত্রে প্রতি ১২ বছর অন্তর পুর্ন কুম্ভমেলা আয়োজিত হয়, ৬ বছর অন্তর গৌন কুম্ভমেলা হয় এবং প্রতি ১৪৪ বছর অন্তর মহা কুম্ভমেলা হয়। 
 প্রাচীন কাল থেকেই একটা রীতি চলে আসছে যে, কুম্ভমেলাতে পুণ্যস্নান করলে মোক্ষলাভ হয়। পীড়িতের  কৃতকর্মের দ্বারা অর্জিত পাপ নাশ হয়। তবে এই মেলাটি শুধু ধার্মিক ক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ না, সামাজিক, সভ্যতা সংস্কৃতি এবং অর্থনৈতিক মেলবন্ধনের পরিচায়ক। বহু সাধূ সন্ন্যাসী, পুণ্যাত্মা, সাধারণ মানুষের সমাবেশ ঘটে এই মেলাতে।  প্রতিবারে প্রায় ৩০থেকে ৪০ কোটি পুণ্যার্থির সমাবেশ হয়েছিল এলাহাবাদের কুম্ভমেলাতে ২০১৯ সালে। এবং ২০১৩ সালের হরিদ্বারে মহাকুম্ভমেলাতে গঙ্গানদীর তীরে সবচেয়ে শান্তিপূর্ণ বৃহৎ জনসমাবেশ হয়েছিল।
সাধূ প্রসঙ্গে বলা যায় বহু সাধূ আসেন পুণ্যভূমিতে মোক্ষলাভের আশায়। সাধূরা তাদের সংসার সম্পর্ক ত্যাগ করে শুধু ইশ্বর সাধনার জন্য গৃহত্যাগী হন। সংসারের মোহ ত্যাগ করে তারা বৈরাগ্য নিয়ে গৃহ ছেড়ে দেশান্তরে ভ্রমন করে আধ্যাত্মিক জ্ঞান অর্জন করেন। তারা পোশাক পরিচ্ছদে বিশ্বাসি নন। তারা মনে করেন তাদের দেহের সাথে নশ্বর দেহের যোগ সম্ভব তার মধ্যে বস্ত্র অনির্বচনীয় বস্তু। এই প্রথা বহু প্রাচীন। বেদ, বেদাঙ্গ, পুরাণাদিতে এর উল্লেখ পাওয়া যায়। সাধূদের জীবন অত্যন্ত কঠোর হয়। অনেক বিধি নিয়মের গন্ডি অতিক্রম করে সাধূর দিক্ষায় দিক্ষিত হওয়া যায়।
এবার আসা যাক  সাধূ এবং সন্নাসীর মধ্যে কী পার্থক্য? যদিও পার্থক্য বের করা দূরহ। সংস্কৃত শব্দ “সাধ” থেকে সাধূ শব্দের উৎপত্তি। যার অর্থ সাধনা অর্থ্যাৎ যারা সাধনার মাধ্যমে নিজের জীবন অতিবাহিত করেন। কঠোর তপস্যার মাধ্যমে মোক্ষলাভের জ্ঞান অর্জনের মার্গ। সাধূরা পোশাক পরিধানে গুরুত্ব দেননা। সাধূরা পরিভ্রমনের মাধ্যমে ইশ্বরির জ্ঞান বিতরণ করেন। 
অপরপক্ষে সন্ন্যাসী শব্দটি সংস্কৃত শব্দ ‘সম্’ এবং ‘নাস’ শব্দের মিলনে গঠিত হয়েছে। যার অর্থ সংসারের সমস্ত বস্তু যার বিনাশ সম্ভব তা বর্জন করে ইশ্বরচিন্তায় মোক্ষলাভ করার জন্য গৃহত্যাগী হয়ে পরিভ্রমণ। মূলত সাধূ এবং সন্নাসীর সংজ্ঞা একই মনে হলেও দুটির অন্তর্নিহিত অর্থ ভিন্ন। 
 
 
কুম্ভ মেলা ভারতীয় সভত্যায় এমন এক মিলন ক্ষেত্র যেখানে জাতি, ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে যোগদান করে। কলা কৌশল, সভত্যা, ঐতিহ্য, অর্থনৈতিক মেলবন্ধন ঘটে। বহূ মানুষের সমাবেশ ঘটে। দূরদূরান্ত থেকেও পুণ্যার্থিরা আসেন। 
কুম্ভমেলার সবথেকে আশ্চর্যজনক জীনিস হলো সেখানকার আখড়া গুলো। মনোমুগ্ধকর পরিবেশ এবং অস্ত্রশস্ত্র সজ্জিত সাধূসন্তে পরিপুর্ণ মেলা পুণ্যপ্রাঙ্গন। কুম্ভতে প্রধানত চারটি প্রধান আখড়া আছে এবং ১৩টি গৌন আখড়া। আখড়া গুলি পরস্পরের সাথে যুদ্ধবিদ্যা ও কলা কৌশল প্রর্দশনের মধ্যে লিপ্ত থাকে। যার ফলে হিন্দুধর্মের ঐতিহ্য প্রকাশ পায়। এই প্রথার সূচনা করেন আদি শংকরাচার্য।২০১৯ সালে প্রথমবারের মতো বৃহন্নলাদের জন্য পৃথক আখড়া গঠন করা হয়। যার নাম কিন্নর আখড়া। 
 কুম্ভের চারটি আখড়ার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো বৈষ্ণব আখড়া, শৈব আখড়া, শাক্ত সম্প্রদায়ের আখড়া এবং উদাসীন সন্নাসীদের আখড়া। হিন্দু ধর্মকে রক্ষা করার জন্য তারা অস্ত্র ধারন করে। সাধূরা মূলত হিন্দু যোদ্ধা। কুম্ভমেলাতে যেইসব প্রকার সাধূদের দেখা যায় তাদের বেশির ভাগই হলো নাগা সাধূ। নাগারা শিবের উপাসনা করেন। তারা উলঙ্গ অবস্থায় থাকতে পছন্দ করেন। সোনা, রূপা বা কাঠের আসনের ওপর বসে তারা তপস্যা করেন। নাগা শব্দের প্রধান অর্থ হিন্দু যোদ্ধা।  যারা হিন্দু ধর্মকে রক্ষা করারা জন্য শাস্ত্র এবং শস্ত্রে সমান পারদর্শী হন। নাগারা মুলত দিনে একবার আহার করেন তাও নূন্যতম পরিমানে। তাদের মূল মন্ত্র সংযম। নাগারা কেও কেও হাতি, দোলা, ঘোড়া বা পদবর্জের মাধ্যমে মেলাতে প্রবেশ করেন। এবং নিজের জীবন হিন্দু ধর্ম এবং আরাধ্যদেবতার প্রতি সমর্পণ করেদিয়েছেন। 
কুম্ভমেলাতে নানা বয়সের ব্যাক্তিরা নাগা সাধূদের কঠোর দিক্ষাতে দিক্ষিত হন। তাদের দিক্ষা পর্বও অত্যন্ত কঠোর হয়। কুম্ভমেলা অনন্য আকর্ষণ হলো নদীগাত্রের আরতি। লাখ লাখ সাধূ ভক্তরা হাতে প্রজ্জ্বলিত প্রদিপ নিয়ে নিজের আরাধ্যদেবতার উদ্দেশ্যে যে আরতির আয়োজন করে তা দেখার মতো। এই আরতি দেখার জন্য জনজোয়ারের সৃষ্টি হয়। তাদের উচ্চারিত ধ্বনিতে পুরো সমাজ মুখোরিত হয়ে ওঠে। বহু নাগার একত্র সমাবেশ ঘটে এই মেলাতে। বহূ সাধূ হিমালয় থেকে এসে যোগ দেয় এই মেলাতে। নাগারা তাদের দেহ ছাই দ্বারা আবৃত করে রাখে। কেও একখন্ড কাপড় পরিধান করেন। তাদের জীবন অত্যন্ত কঠোর তাই তারা সাধারণ মানুষের থেকে অনেক মহান। 
কুম্ভমেলাতে নাগা সম্প্রদায়ের সাধূরা ছাড়াও আরেক প্রকার সাধূর সমাবেশ লক্ষ্য করা যায়। তারা হলেন অঘোরী। অঘোরীদের জীবন অত্যন্ত কঠোর। তারা প্রেত সাধনাতে মত্ত থাকেন। অঘোরীদের প্রধান আহার মৃত শব। তাদের আরাধ্য দেবতা শিব বা মহাকাল। অঘোরীরা অত্যন্ত ক্রুদ্ধ প্রকৃতির হয় বলে জানা যায়। 
প্রাচিন ভারতীয় সভ্যতায় আরেক প্রকারের সাধকের উল্লেখ পাওয়া যায়। তারা হলো কাপালিক। তন্ত্রসাধনায় সিদ্ধিলাভের আশায় নিমগ্ন থাকেন। এদের প্রধান উপাস্য দেবী হলেন কালী। এদের জীবনও অত্যন্ত কঠোর। অনেক গুলো চরণের মাধ্যমে এদের দিক্ষাপর্ব সম্পুর্ন হয়। রক্তবস্ত্র পরিধান করে এই সাধূরা নিজের জীবন অতিবাহিত করেন। 
কুম্ভমেলা তে আরেক প্রকার সাধূর উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। তারা হলেন বৈষ্ণব সাধক। এদের উপাস্য দেবতা পালন কর্তা শ্রী বিষ্ণু। এদের  উপাসনা বাকিদের তুলনায় একটু আলাদা। এরা বিশ্বাস করে নাম সংকীর্তনের মাধ্যমে ইশ্বর লাভ সম্ভব। কঠোর উপাসনা যাগযজ্ঞ প্রভৃতি আচার অনুষ্ঠানে এরা বিশ্বাসি নয়। 
সংসারের মোহ, ক্রোধ, লোভ, মায়া বাধন অতিক্রম করে শুধু মাত্র শান্তি আর ইশ্বর লাভ করার জন্য নিজেকে অর্পন করা অতোটাও সুখকর না। এই কুম্ভমেলাতে অনেক পুণ্যাত্মা, সাধূসন্তের সমাবেশ ঘটে, যাদের সাধনায় সমগ্র সংসার সুখকর হয়। সাধূ সন্তদের বানী গুঞ্জিত হয়। আরাধ্যদেবতার নামে মুখরিত হয় গোটা নদীতট। 
শুধু তাই নয় নানা আচার সংস্কারের মিলন ঘটে এই মেলাতে। দেশের নানা প্রান্ত থেকে লোক আসে এই পুণ্য ক্ষেত্রে। যার প্রধান ধারক এই সাধূরাই। এনাদের মাধ্যমে সংস্কৃতির মেলবন্ধন ঘটে আসছে সেই সুদূর কাল থেকে। শুধু ভারতেইনা এই মেলার প্রাসার বহির্বিশ্বেও ছড়িয়ে পড়েছে। এই মেলা শুধু সংস্কৃতিরই মেলবন্ধননা অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও এর প্রসার অতূলনিয়। জীবন যাত্রায় এই মেলার গুরুত্ব অপরিসীম। 
তবে প্রাচীন কালের সময়ের পরিস্থিতির থেকে এখনকার দিনের পরিস্থিতির অনেক পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়। মানসিক, সামাজিক অর্থনৈতিক দিক থেকে এখনকার দিনের মানুষ অনেক উন্নত হলেও এই পরিবর্তনের ছোঁয়া সাধূসন্তদের জীবনে সেইভাবে প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হয়নি। সাধূদের জীবনধারা যেমনছিলো তেমনই আছে। সাধূদের পরিব্রাজক জীবনের পরিবর্তন আসেনি। 
তবে পরিশেষে উল্লেখ্য কুম্ভমেলা সারা পৃথিবীর এক সম্পদ এক সংস্কার। যা মানুষের সাথে মানুষের মিলন, মনের সাথে মনের মিলন। সারাবছর পরিশ্রমের পর মানুষের শান্তিলাভ করার জন্য এই মেলা এক মুখ্য ভূমিকা পালন করে। প্রাচীন কালেও এই মেলা সমান মহিমায় চলে এসেছিল এবং ভবিষ্যতেও এই ধারা অটুট থাকবে।
Leave a Reply