Posted on Leave a comment

রাজন্য আমলের ত্রিপুরার শিক্ষাব্যবস্থা

রাজন্য আমলের ত্রিপুরার শিক্ষাব্যবস্থা -ডঃ অনুপম সরকার

ভারতের উত্তর-পূর্ব দিকের রাজ্য ত্রিপুরা, অনেকদিন রাজন্যশাসিত ছিল । বর্তমান বাংলাদেশের অনেকাংশেই  ত্রিপুরা রাজ্যের সীমানা বিস্তৃত ছিল  । চন্দ্রবংশীয় মানিক্য উপাধি প্রাপ্ত রাজারাই উত্তরাধিকার সূত্রে  এখানে রাজ্য শাসন করে গেছেন । “ রাজমালা “ গ্রন্থে রাজবংশের কীর্তি কাহিনি বর্ণিত  হয়েছে ।  এই গ্রন্থের বিবরণ থেকে আমরা মহারাজা বীরচন্দ্র মাণিক্যের পূর্ববর্তী রাজাদের শিক্ষাবিস্তার সম্পর্কে কোন পরিচয় পাই না । রাজপরিবারের শিক্ষা ব্যবস্থার বিবরণ থাকলেও সাধারণ প্রজাদের জন্য  প্রবর্তিত শিক্ষার প্রচেষ্টা তেমন  দেখা যায় না । এই প্রসঙ্গে সমালোচক বলেছেন – “ মানিক্য বংশের সূচনা কাল থেকে ঊনবিংশ শতকের ৬ – ১০ অব্দ পর্যন্ত ত্রিপুরা রাজ্যের সাধারণ প্রজাদের বিদ্যা শিক্ষার জন্য কোন প্রকার প্রতিষ্ঠান ছিল এরূপ সাক্ষ্য রাজমালা বা অন্যান্য আকর  গ্রন্থাদিতে পাওয়া যায় না । ধারণা করা যেতে পারে যে  যেহেতু রাজকীয় প্রশাসন  বালক বালিকাদের শিক্ষার দায়িত্ব বহন করত না ।  সেজন্যই শিক্ষার জন্য কোন প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেনি । “ (১)

প্রথমদিকে ত্রিপুরার রাজারা বাইরে থেকে লোক আনিয়ে  প্রশাসনিক কাজ করেছেন । সমালোচক বলেছেন -“এভাবে বিশ্বসদের দিয়ে  প্রশাসনের লেখাপড়ার কাজ চলে যেত বলে রাজ্যের নিজস্ব কর্মচারী বাহিনী তৈরি করার কোন উদ্যোগ ত্রিপুরার রাজাগণ নেননি । মোহরীর কাজ করতে যে সামান্য লেখাপড়া জানা দরকার হয় তার জন্য বিদ্যালয় স্থাপন করে প্রজাদের শিক্ষিত করে রাজকার্যের উপযোগী করে তোলার প্রচেষ্টাও তারা করেননি । “ (২) রাজধানী পরিবর্তনসহ রাজাদের বিভিন্ন পরিবর্তন এর মধ্যেও শিক্ষাব্যবস্থার হাল একই থেকে যায় ।  শিক্ষাব্যবস্থা আগরতলা শহর কেন্দ্রিক ছিল তাতে রাজ্যের অন্যান্য অংশের মানুষের কোন যোগ  ছিল না । রাজপরিবারের সদস্যদের জন্য গৃহশিক্ষক রেখে পাঠদানের ব্যবস্থা করা হয়েছিল ।  মহারাজা কৃষ্ণকিশোর মানিক্যের আমলে  ত্রিপুরায় প্রথম পাঠশালা চালু হয় –   কৃষ্ণ কিশোর মানিক্যের রাজত্বের শেষার্ধে পুরাতন আগরতলায় রাজবংশীয় পুরুষ এবং বিশ্বস্ত অভিজাত কর্মচারীদের সন্তানদের জন্য চালু পাঠশালায় ইংরেজি পড়াশোনার সূত্রপাত হয়ে গিয়েছিল । “ (৩) কিন্তু বিভিন্ন সমস্যার মধ্য দিয়েও বিদ্যালয়টি চালু ছিল ।  মহারাজা বীরচন্দ্র মাণিক্যের সিংহাসনে আরোহণের পর তিনি উপলব্ধি করেন রাজ্যের শিক্ষা প্রসারের জন্য ।

বীরচন্দ্র মাণিক্যের আমলে ত্রিপুরার শিক্ষা ব্যবস্থা :-

মহারাজা বীরচন্দ্র মানিক্য ত্রিপুরার শিক্ষা ব্যবস্থার অনেকটাই পরিবর্তন করেন ।  ড.  নলিনীরঞ্জন ভট্টাচার্য্য বলেছেন – 

 মহারাজ বীরচন্দ্র মানিক্য এই প্রথম রাজ্যবাসির শিক্ষার দায়িত্ব সরকারিভাবে গ্রহণ করেন।“

১৮৭১  সালে তৎকালীন ভারতের গভর্নর জেনারেল লর্ড মেয়ো এ ডব্লিউ বি  পাওয়ারকে রাজনৈতিক প্রতিনিধি হিসেবে  ত্রিপুরাতে পাঠান ।  পাওয়ার এর সহযোগিতায় বীরচন্দ্র মানিক্য ত্রিপুরার আভ্যন্তরীণ সংস্কারের কাজ শুরু করেন ।  ১৮৭২  সালে কৈলাশহরে একটি বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয় ।  ১৮৯০ সাল থেকেই ছেলে ও মেয়ে উভয়ের জন্য প্রাথমিক পর্যায়ের শিক্ষার সূত্রপাত ঘটে । ১৮৯০  সালের ১৫ই  ডিসেম্বর ত্রিপুরার প্রথম উচ্চবিদ্যালয় রূপে আগরতলা সরকারি ইংরেজি বিদ্যালয়  নামক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান  এর সূচনা ঘটে । ১৯০৪  খ্রিস্টাব্দে একুশে ফেব্রুয়ারি থেকে এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি উমাকান্ত একাডেমি নামে পরিচিতি লাভ করে ।  জনসংখ্যার নিরিখে দেখতে গেলে এই প্রয়াস সামান্য ছিল ।  সমালোচক বলেছেন – 

  উনিশ শতকের শেষ দিকে প্রকাশিত বঙ্গীয় প্রশাসনিক বিবরণ গুলিতে ত্রিপুরা রাজ্যের শিক্ষার গতির শ্লথের কারণ  হিসাবে অনুপযুক্ত স্থানে স্কুল নির্মাণ বা স্থাপন ,  উপযুক্ত পরিদর্শন ও তদারককারীর  অভাব, শিক্ষকদের সময় মতো বেতন প্রদানের অনিশ্চয়তা ,জনগণকে  আর্থিক সাহায্য প্রদান  না করা প্রভৃতির কথা উল্লেখ থাকলেও রাজ্য সরকার শিক্ষায় উৎসাহ প্রদান করার উদ্দেশ্যে কী কী ব্যবস্থা নিয়েছিলো তার কোনো উল্লেখ  বিশেষ নেই ।” (৫) 

সেই সময়  শহরাঞ্চলে শিক্ষার সুবিধাগুলো ছিল । গ্রামাঞ্চল,  বিশেষ করে পাহাড়ি জনপদগুলোতে শিক্ষার কোন ব্যবস্থা ছিল না ।  দৈনন্দিন জীবন  চর্চার জন্য প্রয়োজনীয় শিক্ষাটুকু পাহাড়ী জনপদে দেখা যায়নি ।  পাশাপাশি ককবরক  ভাষার উন্নতিও তেমন ঘটেনি । কিন্তু সময়ের অগ্রগতির সাথে সাথে ত্রিপুরার সামগ্রিক শিক্ষার রূপরেখাটি কিছুটা পাল্টাতে থাকে ।  তাই দেখা যায় ত্রিপুরার পরবর্তী মহারাজারা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা আগ্রহ প্রকাশ করেছেন । ১৮৮০ – ১৮৮১  সালে Bengali Administration Report – এ বলা হয়েছিল –

“ of the 700 pupis , 30 are the sons of thakurs 52 Tipperans 232 manipuris and the remainder ( 3882 ) Bengali , Hindus and Mussalmans of 57 girls attending schools , there are tipperans and 54 manipuris .”

বীরচন্দ্রের আমলে শিক্ষা ব্যবস্থার তিনটি দিক লক্ষ্য করা যায় – 

১)  তিনি শিক্ষার ক্ষেত্রে পক্ষপাতদুষ্ট ছিলেন না।  রাজ পরিবারের সদস্যরা সহ রাজকর্মচারীদের সন্তানরা সাধারণ বর্গের  ছেলে মেয়েদের মত একই শিক্ষা লাভ করতো ।

২) শিক্ষার ক্ষেত্রে তিনি জাতি-ধর্ম-বর্ণের কোন ভেদাভেদ মানতেন না ।

৩)  নারী শিক্ষার প্রসারের জন্য তিনি চেষ্টা করে গেছেন ।  রাজ অন্তঃপুরের নারীদের পাশাপাশি তিনি  মেয়েদের শিক্ষার ক্ষেত্রে বিশেষ নজর দেন ।

শিক্ষার প্রসার ও মান উন্নয়নের জন্য তিনি কয়েকটি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন যা ত্রিপুরার শিক্ষা ব্যবস্থায়  যথেষ্ট সফলতা নিয়ে আসে । 

১) শিক্ষকদের বেতন স্বল্পতা,  বিদ্যালয়  চালানোর পরিকাঠামোর বিফলতা দূর করার জন্য ব্যবস্থা গ্রহণ ।

২) রাজ্যের বিভিন্ন বিদ্যালয়ে প্রাথমিক শিক্ষা দানের উদ্দেশ্যে শিক্ষকদের এ বছরের জন্য প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা ।

৩)  নতুন হাবেলীতে  শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের জন্য একজন পন্ডিত নিযুক্ত করা হয়েছে । 

৪)  প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শিক্ষকদের অতিরিক্ত বেতন ধার্য করা হয়েছে । 

৫) ১৩০৮ ত্রিপুরাব্দে প্রকাশিত একটি শিক্ষা সম্বন্ধীয় আইনে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শিক্ষকদের বেতন বৃদ্ধির কথা বলা হয়েছে ।

মহারাজা বীরচন্দ্র মাণিক্যের আমলে নতুন উচ্চ বিদ্যালয় ,  একটি বালিকা বিদ্যালয় ,  কিছু প্রাথমিক বিদ্যালয় ,  একটি টোল খোলা হয়েছিল । কালীপ্রসন্ন সেনগুপ্ত পঞ্চ মানিক্য গ্রন্থে বলেছেন – “ তৎকালোচিত  নিয়মে মহারাজা বাংলা ও উর্দু ভাষায় ব্যুৎপত্তি লাভ করেছিলেন ,  সংস্কৃত ও ইংরেজি ভাষায় ও কথঞ্চিত  অধিকার ছিল । তিনি মনিপুরী , ত্রিপুরা এবং উর্দূ ভাষায় মাতৃভাষার  ন্যায় অনায়াসে আলাপাদি করিতে পারিতেন ।” (৭)  

রাধাকিশোর মানিক্যের আমলে শিক্ষা ব্যবস্থা 

বীরচন্দ্র মাণিক্যের পর তার যোগ্য উত্তরাধিকারী রাধা কিশোর মানিক্য ত্রিপুরার সিংহাসনে বসেন ।  পিতার মতো তিনিও রাজ্যের শিক্ষা বিস্তারের ক্ষেত্রে মনোযোগী হন ।  বিশেষ করে উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে ।  এজন্য তিনি ১৯০১  সালে আগরতলার উমাকান্ত একাডেমি প্রাঙ্গনে  একটি দ্বিতীয় গ্রেডের কলেজ স্থাপন করেন । কলেজটির নামকরণ করা হয় আগরতলা কলেজ ।  এটি সম্পূর্ণ অবৈতনিক ছিল । বিদ্যালয়ের পুরোটা খরচই রাজার কোষাগার থেকে আসতো ,  এছাড়া মহাবিদ্যালয় এর ২ জন ছাত্রকে রাজ সরকার থেকে বৃত্তি দেওয়া হতো ।  এছাড়া মহাবিদ্যালয়ের ছাত্রদের জন্য আবাসিক গৃহের ব্যবস্থাও ছিল । ১৩১৩ ত্রিপুরাব্দের ২৮ শে কার্তিক ত্রিপুরা রাজ সরকারের এক বিবরণ থেকে জানা যায় ২৬ শে  কার্তিক এক অগ্নিকাণ্ডে মহাবিদ্যালয়য়ের সবকিছু পুড়ে ছাই হয়ে যায় । তৎকালীন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু নিয়ম  কানুন পূরণ করতে না পারায় এই মহাবিদ্যালয় বন্ধ হয়ে যায় ।  রাধাকিশোর মানিক্য কুমিল্লার ভিক্টোরিয়া কলেজের জন্য অর্থ বরাদ্দ করেছেন ।  মহারাজা রাধাকিশোর মানিক্য শিক্ষাকে বিক্রয় বা ছাত্রদের থেকে টাকা না নেওয়ার পক্ষে ছিলেন। এ প্রসঙ্গে সমালোচক বলেছেন –

“Radha Kishor at the very beginning of the present century , i.e. in 1901 , Started a free college at Agartala to give higher education to whose ever was  fit to receive it ,  and when being alarmed by the prospects,  then British dominated Calcutta University insisted on a fee being levied ,  the Maharaja decided to abolish the college rather than ‘sell’  education against the hoary  traditions of India and his is dynasty .” ( ৮)

বিভিন্ন রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের ফলে ১৯০৪  সালে আগস্ট-সেপ্টেম্বর মাসে আগরতলা কলেজ একেবারে বন্ধ হয়ে যায় ।  এটি একেবারে অবৈতনিক  ছিল বলে দরিদ্র শিক্ষার্থীদের পাঠচর্চায় সুবিধা হয়েছিল ।

মহারাজা বীরচন্দ্র এর আমলে শিক্ষা ব্যবস্থা 

মহারাজা বীরচন্দ্র মানিক্যকে  যথার্থভাবেই ত্রিপুরার আধুনিক রূপকার বলা হয় ।  ত্রিপুরা রাজ্যের শাসনের সব দিকেই তিনি  তাঁর কৃতিত্বের পরিচয় দিয়েছেন । পূর্ববর্তী রাজাদের রাজকীয় বৈশিষ্ট্য  তিনি উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়েছেন ।  এছাড়া দেশ ও বিদেশ ভ্রমণ করে শিক্ষার আধুনিকতা ও বিস্তার কীভাবে করতে হয় তা বুঝেছিলেন ।  ১৯৩৭ খ্রি : ৭ ই মে তিনি “বিদ্যাপত্তন” নামে একটি পরিকল্পনা গ্রহণ করেন ।  এই পরিকল্পনায় একটি কলেজ স্থাপনের কথা বলা হয় এবং এই কলেজের নকশা মহারাজা নিজেই করেছিলেন ।  এই প্রসঙ্গে সমালোচক বলেছেন –   তিনি (মহারাজা বীর বিক্রম)  বিদ্যাপত্তন নামে একটি পরিকল্পনার মাধ্যমে আগরতলায় একটি গ্রামীণ বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছিলেন । তিনি বিদ্যাপত্তনের পরিকল্পনা অনুযায়ী ত্রিপুরায় এমন একটি গ্রামীণ বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করতে চেয়েছিলেন  যার অধীনে থাকবে সাধারণ ডিগ্রী কলেজ , মেডিকেল কলেজ,  কৃষি ,  চারুকলা ও  ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ । এর জন্য আগরতলা শহরের  পূর্বপ্রান্তে কলেজটিলায় জমিও নির্দিষ্ট করা হয় ।  কিন্তু বীর বিক্রম কিশোর মানিক্য তার জীবিত কালে এই পরিকল্পনাকে বাস্তবায়িত করে যেতে পারেননি ।  তার মৃত্যুর পর এই পরিকল্পনার আংশিক রূপদান করা হয় মহারাজা বীর বিক্রম কলেজ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ।” (৯)


শুধুমাত্র মহাবিদ্যালয় নয় , বিদ্যাপত্তন পরিকল্পনায় যুক্ত হয়েছিল –  ইংরেজি বিদ্যালয় ,  কারিগরি বিদ্যালয় ,  সংগীত ও নৃত্যের মহাবিদ্যালয় , অংকন ও স্থাপত্যের মহাবিদ্যালয় , মেডিকেল বিদ্যালয় , একটি সাধারণ  পাঠাগার । ১৯৩৭ খ্রি : ৭ ই মে বীরবিক্রম কলেজের কাজ শুরু হয় ।  অধ্যাপক শ্রী  সুচিন্ত্য ভট্টাচার্য্য বলেছেন – “ বিশেষজ্ঞদের মতে ,  এই মহাবিদ্যালয়টি গঠনশৈলী প্রাচ্য ও প্রতীচ্যের স্থাপত্য শিল্পের এক অন্যতম নিদর্শন । এর তুলনা চলে শুধু বিকানীর এর বিখ্যাত রাজপ্রাসাদের শিল্পরীতির সঙ্গে ।” (১০) 

মহারাজা বীরবিক্রম কলেজ এর মানচিত্র

রাজন্য আমলের নারী শিক্ষা –

মহারাজা বীরচন্দ্র মাণিক্যের আমল থেকেই রাজ অন্তপুরের নারীদের শিক্ষার ক্ষেত্রে মনোযোগ দেওয়া হয় । এই প্রসঙ্গে নবদ্বীপচন্দ্র দেববর্মন বলেছেন –   মহারাজ আশ্চর্য উৎসাহশীলতায়  এবং উদ্দীপনায় সেই যুগের ঘোর রক্ষণশীল পরিবর্তন-বিরোধী সমাজের মধ্যে থাকা সত্ত্বেও নতুন শিক্ষা সভ্যতার দিকে  উন্মুখ হইয়া উঠিয়াছিল । বস্তুত তাহার ব্যক্তিত্বের প্রভাবে এমন একটা কিছু পরিবর্তন মূলক ছিল যে তাহা প্রতিরোধ করা শক্তই হইত । “ (১১) ১৯২৩ – ১৯৪২ সালের প্রশাসনিক বিবরণ সমূহ থেকে জানা যায় যে সেই সময়ে রাজ অন্তপুরের নারীদের শিক্ষার জন্য মহিলা শিক্ষক নিযুক্ত করা হয়েছিল ।  রাধা কিশোর মানিক্যের রাজত্বকালেও রাজ্যে নারী শিক্ষার বিস্তার ঘটে । ১৮৯০ – ৯১ খ্রি  মহারানি তুলসীবতী  রাজবাড়িতেই মেয়েদের শিক্ষার ব্যবস্থা করেন ।  তার নাম অনুসারেই পরে তুলসীবতী বালিকা বিদ্যালয় স্থাপিত হয় ।  

মহারানি তুলসীবতী বালিকা বিদ্যালয়

১৮৯৪ খ্রিঃ দেওয়ান বিজয়কুমার সেন এর নাম অনুসারে বিজয়কুমার বালিকা বিদ্যালয় স্থাপিত হয় ।  এছাড়াও রাজ্যের বিভিন্ন এলাকায় কিছু কিছু বালিকা বিদ্যালয়ে মেয়েদের পঠন পাঠনের ব্যবস্থা করা হয় । ১৯২৭ সালে ত্রিপুরায় হিতসাধিনী  সভা প্রতিষ্ঠিত হয় ।  এই সভার কর্মকর্তারাও ত্রিপুরার নারী শিক্ষার বিস্তারে সাহায্য করেছিলেন । ১৮৮৩ খ্রিঃ  ত্রিপুরা রাজ্য ও  ত্রিপুরা জেলার  শিক্ষা বিস্তারে জন্য “ ত্রিপুরা অন্তঃপুর স্ত্রী  শিক্ষা সভা” গঠিত হয় ।  এক প্রান্তীয় রাজ্যে ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ দিক থেকে রাজাদের পৃষ্ঠপোষকতায় ত্রিপুরায় স্ত্রী শিক্ষা বিস্তারের সূচনা হয় । ত্রিপুরা রাজ্যের প্রশাসনিক বিবরণগুলো থেকে রাজন্য আমলে প্রতিষ্ঠিত বিভিন্ন বালিকা বিদ্যালয় ও তার ছাত্রী সংখ্যার একটি ছক তুলে ধরা হলো –

সন ত্রিপুরাব্দ

পাঠশালা

এল. ভি. স্কুল

এম. ই.  স্কুল

বিদ্যালয় সংখ্যা

ছাত্রী সংখ্যা

বিদ্যালয় সংখ্যা

ছাত্রী সংখ্যা

বিদ্যালয় সংখ্যা

ছাত্রী সংখ্যা

১৩৩৩

১১

২০২

১১

২০২

১৩

১৩৩৪

১৯০

১৯

১৩৩৫

১৯২

৭০

১৩৩৬

১৮৯

৮৫

১৩৩৭

১০

২৩৪

৯৫

১৩৩৮

১০

৩১৯

৯৬

১৩৩৯

১০

৩০২

৫৬

১৩৪০

১০

২৯১

৮৫

১৩৪১

১০

২৯১

৮৫

১৩৪২

২৭৩

৮৯

১৩৪৩

৩১৯

৭৭

১৩৪৪

৩২৯

৬৮

১৩৪৫

১৩৮

৭৪

১৩৪৬

২৭৮

১২১

১৩৪৭

২৮৬

১৫৩

১৩৪৮

৪৪

২৭০

১৪৩

১৩৪৯

৫৯

১৫৫

৩৭৩

১৩৫০

২২২

২১৫

১৩৫১

২৪৫

২৬৭

১৩৫২

৫৩

২১১৬

২২৩

২৮৭

১৩৫৩

৭৮

২১১২

২৩১

২২৩

১৩৫৪

৮৩

৩০৯২

২০৯

২৩২

১৩৫৫

৮৬

৩২৬৬

২৫৬

৩৫০


উনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে থেকে ভারতবর্ষের স্বাধীনতা প্রাপ্তির পর্যন্ত সাধারণ জনগণের মধ্যে শিক্ষা চেতনা বিস্তৃত করার উদ্দেশ্যে রাজারা বিশেষ ভূমিকা নিয়েছিলেন । প্রচলিত সাধারণ পর্যায়ের শিক্ষার পাশাপাশি অন্যান্য ধরনের যেমন -কারিগরি শিক্ষা, কৃষি সংক্রান্ত শিক্ষা, সংস্কৃত শিক্ষা , মাদ্রাসা শিক্ষা ,সাজাপ্রাপ্ত কয়েদিদের জন্য শিক্ষার ব্যবস্থা করা হয় । ভারতবর্ষের সাথে  যোগদানের পর ত্রিপুরাতে ভারত সরকার পরিচালিত শিক্ষাব্যবস্থার আদলেই তার কাঠামো  বদলায় । রাজন্য আমল থেকে শিক্ষা ব্যবস্থার যে সূচনা হয় তা বর্তমানে বিভিন্ন রাজ্য সরকারের প্রচেষ্টায় বেড়েই চলেছে । এই প্রসঙ্গে সমালোচক বলেছেন – “শিক্ষার প্রতি ত্রিপুরাতে রাজন্যশক্তির যে তীব্র আগ্রহ ও প্রয়াস ছিল , নানা ঘাত – প্রতিঘাত থাকা সত্ত্বেও সেটা সাধারণ শিক্ষা ক্ষেত্রে ছড়িয়ে অন্যান্য বাস্তবোচিত উন্নয়নমুখী শিক্ষা ও কর্মের দিকে ধাবিত হয়েছিল।” (১৩)

তথ্যসূত্র :-   

১/ আধুনিক ত্রিপুরা প্রসঙ্গ বীরচন্দ্র মানিক্য , ড. দ্বিজেন্দ্র নারায়ণ গোস্বামী , অক্ষর পাবলিকেশন্স, আগরতলা , ২০০৫ , পৃষ্ঠা১০ 

২/ তদেব , পৃষ্ঠা – ১৩

৩/ ত্রিপুরার শিক্ষা সংস্কৃতির শিকড়ের সন্ধানে , মৃণালকান্তি দেবরায় , ত্রিপুরা দর্পণ , ২০০৩ ইং , আগরতালা , পৃষ্ঠা – ৩২ 

৪/ মানিক্য শাসনাধীন ত্রিপুরার ইতিহাস , ড. নলিনীরঞ্জন রায়চৌধুরী , জ্ঞান বিচিত্রা, ত্রিপুরা , ১৯৯৮ , পৃষ্ঠা৪৫

৫/ আধুনিক ত্রিপুরা প্রসঙ্গ বীরচন্দ্র মানিক্য , ড. দ্বিজেন্দ্র নারায়ণ গোস্বামী , অক্ষর পাবলিকেশন্স, আগরতলা , ২০০৫ , পৃষ্ঠা– ১১ 

৬/ শিক্ষা পরিক্রমায় ত্রিপুরা , ড. শান্তানু ভট্টাচার্য , নয়া পুস্তক মহল , আগরতলা , ২০২০ , পৃষ্ঠা২৭

৭/ পঞ্চ মানিক্য , কালীপ্রসন্ন সেনগুপ্ত , ত্রিপুরা রাজ্য উপজাতি  সাংস্কৃতিক    গবেষণাকেন্দ্রে  ও সংগ্রহশালা ,  ত্রিপুরা সরকার , ১৯৯৬  ইং , পৃষ্ঠা – ৩১

৮/ শিক্ষা পরিক্রমায় ত্রিপুরা , ড. শান্তানু ভট্টাচার্য , নয়া পুস্তক মহল , আগরতলা , ২০২০ , পৃষ্ঠা – ৪২

৯/ মানিক্য শাসনাধীন ত্রিপুরার ইতিহাস , ড. নলিনীরঞ্জন রায়চৌধুরী , জ্ঞান বিচিত্রা, ত্রিপুরা , ১৯৯৮ ,  পৃষ্ঠা – ৪২

১০/ শিক্ষা পরিক্রমায় ত্রিপুরা , ড. শান্তানু ভট্টাচার্য , নয়া পুস্তক মহল , আগরতলা , ২০২০, পৃষ্ঠা – ৫২

১১/ আবর্জনার ঝুড়ি ,  নবদ্বীপচন্দ্র দেববর্মা ও  অরুণ দেববর্মা ,  সম্পাদনা – ডঃ দ্বিজেন্দ্র নারায়ন গোস্বামী ,  উপজাতি গবেষণা ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র ,  ত্রিপুরা সরকার ,  ২০০৪ ,  পৃষ্ঠা – ২৫

১২/ শিক্ষা পরিক্রমায় ত্রিপুরা , ড. শান্তানু ভট্টাচার্য , নয়া পুস্তক মহল , আগরতলা , ২০২০ , পৃষ্ঠা – ৭৫

১৩/ তদেব , পৃষ্ঠা – ১৪৩ 

Leave a Reply